প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পারদ এখন তুঙ্গে। আগামী ২৩ এপ্রিল এবং ২৯ এপ্রিল—দুই দফায় অনুষ্ঠিত হতে চলেছে রাজ্যের হাইভোল্টেজ নির্বাচন। আর এই নির্বাচনকে রক্তপাতহীন এবং অবাধ করতে ভারতের নির্বাচন কমিশন এবার গ্রহণ করেছে এক নজিরবিহীন নিরাপত্তা কৌশল। প্রশাসনিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, আগামী ৩১ মার্চের এক বিশেষ ‘ডেডলাইন’-এর মধ্যেই রাজ্যে আরও ৩০০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী (CAPF) প্রবেশ করতে চলেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ভোটের অনেক আগেই কেন এই বিপুল রণসজ্জা? কমিশনের আসল ‘মিশন’ কী শুধুই নিরাপত্তা, নাকি এর গভীরে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো ছক?
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই দফায় আসা ৩০০ কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটি মোতায়েন করা হচ্ছে কলকাতায়। মহানগরের অলিগলি এবং ঘিঞ্জি এলাকাগুলোতে শান্তি বজায় রাখতে একযোগে ৩০ কোম্পানি সিআরপিএফ (CRPF) মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সাধারণত কলকাতার মত জনবহুল এলাকায় ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ ওঠে বারবার। সেই ট্র্যাডিশন ভাঙতেই কি এবার তিলোত্তমাকে দুর্গের মতো ঘিরে ফেলতে চাইছে কমিশন? শহরের প্রতিটি স্পর্শকাতর মোড়ে কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই আগাম উপস্থিতি নিশ্চিতভাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে।
শুধুমাত্র কলকাতা নয়, উত্তর থেকে দক্ষিণ—পুরো রাজ্যকেই নিরাপত্তার চাদরে মুড়ে ফেলতে চাইছে কমিশন। কলকাতার পরেই তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর। রাজনৈতিক সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে এই জেলায়, আর সেই কারণেই ৩১ মার্চের মধ্যে এখানে ২০ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী পৌঁছে যাবে। অন্যদিকে, উত্তরবঙ্গের কোচবিহার জেলাও কমিশনের রাডারে রয়েছে। সেখানে মোতায়েন করা হচ্ছে ১৮ কোম্পানি বাহিনী। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকা এবং গ্রামীণ বুথগুলোতে যাতে কোনো বহিরাগত হস্তক্ষেপ না ঘটে, তা নিশ্চিত করাই বাহিনীর প্রাথমিক লক্ষ্য।
এবারের বাহিনীর বণ্টনে দেখা যাচ্ছে এক সুপরিকল্পিত গাণিতিক বিন্যাস। বারুইপুর পুলিশ জেলায় ১৭ কোম্পানি এবং মালদা জেলায় ১৫ কোম্পানি বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মালদার মত স্পর্শকাতর জেলায় বাহিনীর এই উপস্থিতি অনুপ্রবেশ এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ রুখতেও সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া মুর্শিদাবাদ এবং বসিরহাট পুলিশ জেলায় ১৩ কোম্পানি করে বাহিনী মোতায়েন করা হচ্ছে। বসিরহাটের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক উত্তাপ বিবেচনা করেই এই সমবণ্টন করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের অন্দরের খবর অনুযায়ী, ৩১ মার্চের এই মোতায়েন আদতে একটি ‘সাইকোলজিক্যাল অপারেশন’ বা মনস্তাত্ত্বিক রণকৌশল। ভোটের অনেক আগে থেকেই কেন্দ্রীয় বাহিনীকে এলাকায় রুট মার্চ এবং ‘এরিয়া ডমিনেশন’-এর কাজে নামিয়ে দেওয়া হবে। এর ফলে একদিকে যেমন দুষ্কৃতীদের মধ্যে ভয়ের আবহ তৈরি হবে, অন্যদিকে সাধারণ ভোটাররা নির্ভয়ে বুথমুখী হতে পারবেন। কমিশনের এই ‘মিশন ৩০০’ মূলত সেই সব ভোটারদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা, যারা অতীতে হিংসার আশঙ্কায় ভোটকেন্দ্র বিমুখ ছিলেন।
আগামী ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা। তার আগে ৩১ মার্চের এই বিপুল বাহিনীর উপস্থিতি প্রমাণ করছে যে, ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে কমিশন কোনো রকম আপস করতে নারাজ। বিরোধীদের অভিযোগ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দাবি—উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিয়ে বাংলাজুড়ে যে এক দুর্ভেদ্য নিরাপত্তা বলয় তৈরি হতে চলেছে, তা এই বাহিনীর বিন্যাস থেকেই পরিষ্কার। এখন দেখার, কেন্দ্রীয় বাহিনীর এই আগাম উপস্থিতি বাংলার নির্বাচনের ইতিহাসে নতুন কোনো নজির গড়তে পারে কি না।
