প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পরিবর্তন? নাকি স্রেফ রঙের প্রলেপে রাজনীতির মহড়া? কলকাতার ঐতিহ্যবাহী শিল্প-সংস্কৃতির পীঠস্থান, অ্যাকাডেমি অফ ফাইন আর্টসের নিরাপত্তা কক্ষের ধূসর দেওয়াল রাতারাতি গেরুয়া রঙে রাঙিয়ে দেওয়া এবং সামনে ভারতমাতার প্রতিকৃতি বসানো নিয়ে এখন রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। কিন্তু এই ঘটনায় সবথেকে বড় ধাক্কাটি এসেছে অন্য জায়গা থেকে। যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আশায় মানুষ একদা বুক বেঁধেছিলেন, সংস্কৃতির আঙিনায় এমন জবরদস্তিমূলক ‘রং বদল’ কি সত্যিই সেই পরিবর্তনের বিজ্ঞাপন? খোদ দক্ষিণপন্থী এবং জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সমর্থকেরাই এখন এই অতি-উত্সাহীদের কাণ্ড দেখে চরম বিরক্ত। তাদের স্পষ্ট প্রশ্ন— এই ধরণের সস্তা প্রতীকী রাজনীতির জন্য কি মানুষ বিকল্প শক্তির ওপর ভরসা করেছিল?
আইনি জটিলতা এড়াতে এবং দলের ভাবমূর্তি বাঁচাতে আসরে নামতে হয়েছে খোদ শীর্ষ নেতৃত্বকে। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য অত্যন্ত কড়া ভাষায় এবং প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গে এই অতি-উত্সাহীদের সাবধান করে দিয়েছেন। তাঁর সাফ কথা, “রং বদলের রাজনীতি দলের লক্ষ্য নয়”। তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়েছেন যে, এই ধরণের কাণ্ড চলতে থাকলে “এবার ডিম আমাদের মাথায় পড়বে, আর আমরা ডিম খেতে রাজি নই”। রাজনৈতিক মহলের মতে, দলীয় নেতৃত্ব খুব ভালো করেই বোঝেন যে, বাংলার সংস্কৃতির শিকড় যেখানে গভীর, সেখানে জবরদস্তিমূলক বা অননুমোদিত উপায়ে দলীয় রঙের ছাপ বসাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে বাধ্য।
এদিকে অ্যাকাডেমির প্রশাসনিক স্তর থেকেও এই কাজের তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছে। অ্যাকাডেমির কার্যনির্বাহী সমিতির সম্পাদক কল্লোল বসু স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই রং পরিবর্তনের জন্য সমিতির তরফ থেকে কোনও পূর্বানুমতি বা প্রস্তাব দেওয়া হয়নি। অর্থাৎ, প্রশাসনের চোখ এড়িয়ে, নিয়ম কানুনের তোয়াক্কা না করে একদল অতি-উৎসাহী কর্মী এই কাজ করেছেন, যা আখেরে দলের রাজনৈতিক ক্ষতিই ডেকে আনছে। ইতিমধ্যেই নাট্যকর্মী, চিত্রশিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের একাংশ এই ঘটনার প্রতিবাদে সরব হয়েছেন এবং গণ-স্বাক্ষর অভিযান শুরু করেছেন।
সমালোচকদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে একটি দলের লড়াই হওয়া উচিত ছিল সুস্থ প্রশাসন, কর্মসংস্থান এবং প্রকৃত উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু তা না করে যদি সংস্কৃতির পীঠস্থানে দেওয়াল চুনকাম করার রাজনীতি শুরু হয়, তবে তা আমজনতার কাছে ভুল বার্তা পাঠায়। অতি-উৎসাহী মহলের এই অবিবেচকের মতো কাজ দলের নীতিকে প্রতিফলিত করে না, বরং সুশীল সমাজের কাছে দলের গ্রহণযোগ্যতা কমিয়ে দেয়। পরিবর্তন মানে যে স্রেফ রঙের প্রলেপ বদলানো নয়, বরং মনন ও সংস্কৃতির মর্যাদা রক্ষা করা— সেই সত্যটা এই অতি-উৎসাহীরা কবে বুঝবেন, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
