প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নবান্নের অলিন্দে এখন বিজেপির পতাকা উড়লেও, দলের অন্দরে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ লড়াই-আন্দোলন ও অত্যাচার সহ্য করা আদি বিজেপি কর্মীদের মধ্যে গত কয়েক মাস ধরে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যময় অসন্তোষ দানা বাঁধছিল। আদি কর্মীদের এই ক্ষোভের প্রধান কারণ ছিল—ক্ষমতা হারানোর পর তৃণমূলের এক বিরাট অংশের নেতা, সাংসদ এবং বিধায়কদের ছদ্মবেশে বা ঘুরপথে বিজেপির ঘনিষ্ঠ হওয়ার মরিয়া চেষ্টা। ঠিক এই জ্বলন্ত পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ২ দিনের কলকাতা সফরে এসে নিচুতলার কর্মীদের মনের ভাষা বুঝলেন এবং অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ নিলেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের এই কড়া বার্তা আদি কর্মীদের যেমন বিপুল অক্সিজেন দিয়েছে, তেমনই ঘুরপথে বিজেপিতে ঢোকার অপেক্ষায় থাকা দলবদলু শিবিরকে এক ঝটকায় দরজার বাইরে ছুঁড়ে ফেলেছে।
রাজনৈতিক মহলের গভীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অসন্তোষের পেছনে দুটি সুনির্দিষ্ট সমীকরণ কাজ করছিল। তৃণমূলের অন্দরে ভাঙন ধরার পর দলটির একাংশ নেতা বেরিয়ে এসে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। রাজনৈতিক মহলে এরা নিজেদের ‘স্বচ্ছ ভাবমূর্তির’ বা ‘ভালো তৃণমূল’ বলে প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। তাদের প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত ছিল, তারা তৃণমূলের মূল নেতৃত্বের থেকে আলাদা। কিন্তু বিজেপির যারা কট্টর ও বুথ স্তরের কর্মী, তারা এই ‘ভালো তৃণমূল’ তত্ত্বকে কোনোভাবেই হজম করতে পারছিলেন না। কর্মীদের সাফ কথা ছিল—”তৃণমূল তৃণমূলই হয়, ভালো বা খারাপ বলে কিছু নেই।” অন্যদিকে, তৃণমূলের প্রায় ২০ জন বিদায়ী সাংসদ সরাসরি বিজেপিতে না ঢুকে আইনি ফাঁকফোকর ও জনরোষ এড়াতে ‘ন্যাশনালিষ্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া’ (NCPI) নামক একটি নতুন ফ্রন্ট তৈরি করে এনডিএ (NDA) জোটের ছাতাতলে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। লক্ষ্য ছিল একটাই—বিজেপি সরকারের সাথে সুসম্পর্ক রেখে আসন্ন পুরসভা নির্বাচনে আসন সমঝোতা করা এবং নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা।
এই সুবিধাবাদী রাজনৈতিক হাওয়াকে সমূলে উপড়ে ফেলতে দলের রাজ্য নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বসেন নিতিন নবীন। তিনি যা বলেছেন, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে বিজেপির আদর্শ ও সংগঠনকে বাঁচানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। তিনি স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন, দলবিরোধী বা দলের নীতি ও সংস্কৃতির সাথে মেলে না, এমন কাউকেই বিজেপিতে নেওয়া যাবে না। কোনো রকম ‘বেনোজল’ ঢুকিয়ে দলের সংস্কৃতি নষ্ট করা চলবে না। বাড়তি সতর্ক থেকে এই দলবদলুদের শক্ত হাতে মোকাবিলা করতে হবে। ক্ষমতার লোভে যারা আজ দল বদলাতে চাইছে, তাদের চেয়ে যারা দুর্দিনে দলের জন্য রক্ত দিয়েছেন, সেই আদি কর্মীদের গুরুত্ব ও আবেগ সবার আগে বুঝতে হবে। ‘ভালো তৃণমূল’ বা ছদ্মবেশী সুযোগ সন্ধানীদের নিয়ে আদি কর্মীদের ক্ষোভ যে সম্পূর্ণ যৌক্তিক, তা দিল্লির এই বার্তার মাধ্যমে সিলমোহর পেল। নিতিন নবীন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে বলেই শুধু সরকারের কাজের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না। সংগঠন মজবুত করতে গেলে অহংকার ত্যাগ করে অত্যন্ত নম্রতার সাথে নিয়মিত সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীন কলকাতায় এসে অত্যন্ত সুকৌশলে এক ঢিলে দুই পাখি মেরেছেন। একদিকে তিনি যেমন ছদ্মবেশী ও দলবদলু তৃণমূলীদের জন্য বিজেপির দরজা চিরতরে বন্ধ করার ইঙ্গিত দিয়ে নিচুতলার কর্মীদের ক্ষোভ প্রশমিত করেছেন, অন্যদিকে ক্ষমতার অহংকারে মত্ত হওয়া নেতাদেরও রাশ টেনেছেন। এই বার্তা পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে বিজেপির নিজস্ব ভাবমূর্তি ও শুদ্ধতা বজায় রাখতে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।
