প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
রাজ্যে পা রাখছে কেন্দ্রীয় বাহিনী, আর তাতেই না কি টান পড়বে আমজনতার রান্নার গ্যাসে! শুক্রবার কলকাতা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন অদ্ভুত আশঙ্কায় কার্যত তাজ্জব রাজনৈতিক মহল। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজতেই ফের একবার কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের সুর চড়াতে মুখ্যমন্ত্রী ‘গ্যাস-রাজনীতি’কে হাতিয়ার করছেন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
শুক্রবার বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, পশ্চিমবঙ্গে যে রান্নার গ্যাস উৎপাদিত হয়, তা যেন কোনোভাবেই রাজ্যের বাইরে না পাঠানো হয়। তাঁর দাবি, ভোটের কাজে ভিন্রাজ্য থেকে প্রচুর সরকারি কর্মী এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী রাজ্যে আসছেন। তাঁদের রান্নার জন্য গ্যাসের প্রয়োজন হবে। আর এই বাড়তি জোগানের চাপে যেন এ রাজ্যের সাধারণ মানুষের ঘরে রান্নার গ্যাসের হাহাকার না পড়ে, সেই বিষয়ে তিনি কেন্দ্রকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিকল্প হিসেবে রাজ্য সরকার কেরোসিনের বরাদ্দ বাড়িয়েছে এবং তা রেশনের মাধ্যমে পাওয়া যাবে বলেও তিনি ঘোষণা করেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে ঘিরেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক। বিজেপি শিবিরের দাবি, কেন্দ্রীয় বাহিনী বা ভোটের কর্মীদের জন্য যে পরিমাণ রান্নার গ্যাস প্রয়োজন হয়, তা রাজ্যের মোট চাহিদার তুলনায় মহাসাগরে এক বিন্দু জলসম। এই নগণ্য বিষয়কে সামনে রেখে গ্যাসের আকালের ভয় দেখানো আসলে সাধারণ মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরির একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক চাল। বিরোধীদের প্রশ্ন, গত কয়েক বছর ধরে রাজ্যে শিল্পায়নের অভাব বা বেকারত্ব নিয়ে কোনো দিশা দেখাতে না পেরে কি এখন ‘গ্যাস’ এবং ‘কেরোসিন’ নিয়ে মানুষকে ভুল বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রান্নার গ্যাসের জোগান ও বণ্টন ব্যবস্থা একটি কেন্দ্রীয় বিষয় (Union List)। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি একটি নির্দিষ্ট জাতীয় গ্রিড মেনে সারাদেশে গ্যাস সরবরাহ করে। মুখ্যমন্ত্রী যেভাবে ‘রাজ্যের গ্যাস রাজ্যে রাখার’ দাবি তুলেছেন, তা ভারতের যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী বলেই মনে করা হচ্ছে। এছাড়া, কেন্দ্রীয় বাহিনীর জন্য আলাদা লজিস্টিক সাপোর্ট থাকে, যার জন্য সাধারণ মানুষের কোটায় হাত পড়ার কোনো প্রশাসনিক নজির নেই। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর এই ‘হুঁশিয়ারি’ প্রশাসনিক সত্যের চেয়ে রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর হিসেবেই বেশি প্রতিভাত হচ্ছে।
মুখ্যমন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে মানুষ এখন গ্যাসে রান্না করতে অভ্যস্ত, অথচ সমাধান হিসেবে তিনি কেরোসিনের বরাদ্দ বাড়ানোর কথা বলছেন। বিরোধীদের কটাক্ষ, যখন প্রধানমন্ত্রী মোদীর ‘উজ্জ্বলা যোজনা’র মাধ্যমে গ্রামে গ্রামে ধোঁয়ামুক্ত রান্নাঘর নিশ্চিত করা হচ্ছে, তখন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মানুষকে ফের সেই পুরনো কেরোসিন আর ধোঁয়ার যুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ২০২৬-এর নির্বাচনে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে একটি প্রধান ইস্যু করতে চাইছে তৃণমূল কংগ্রেস। কেন্দ্রীয় বাহিনীর আগমনের সাথে গ্যাসের অভাবকে জুড়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো—যদি ভবিষ্যতে বণ্টন ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি ঘটে, তবে তার দায় আগাম কেন্দ্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সেই সঙ্গে বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে একটি নেতিবাচক ধারণা তৈরি করাও এর লক্ষ্য হতে পারে।
সব মিলিয়ে, বিমানবন্দরের সেই চত্বর থেকে দেওয়া মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য আদতে নির্বাচনী প্রচারের শুরু বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। তথ্যের চেয়ে আবেগকে প্রাধান্য দিয়ে ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার এই চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যালট বক্সে কতটা প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার।
