প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সদ্য সমাপ্ত শারদোৎসবে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উত্তাপ মণ্ডপের আবহ ছাড়িয়ে গিয়ে ঠেকেছিল বামেদের বুকস্টলে। পুজো জুড়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বাম দলগুলির বইয়ের দোকানে ধারাবাহিক বাধা ও ভাঙচুরের অভিযোগ যেমন উঠেছে, তেমনই উৎসব শেষে বই বিক্রির এক চমকপ্রদ ও রেকর্ড খতিয়ান পেশ করেছে আলিমুদ্দিন। সিপিএম নেতৃত্বের দাবি, স্টল ভাঙচুর ও গেরুয়া শিবিরের বাধাই আদতে তাঁদের জন্য ‘শাপে বর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যার জেরে মানুষ ক্ষোভে আরও বেশি করে বই কিনেছেন।
সিপিএম-এর রাজ্য কমিটির দেওয়া প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এবারের উৎসবের দিনগুলিতে তাদের প্রকাশনা সংস্থা ন্যাশনাল বুক এজেন্সি (NBA) এবং গণ সংগঠনগুলির বুকস্টলে মানুষের ভিড় ছিল নজিরবিহীন। দলের পক্ষ থেকে পেশ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী: গত ২০২৫ সালে যেখানে নির্দিষ্ট ১২টি জেলায় ৪৮ লক্ষ ৪ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছিল, এবার সেই জেলাগুলিতেই বই বিক্রির পরিমাণ একলাফে ১০৪ শতাংশেরও বেশি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮ লক্ষ ৭ হাজার টাকায়! অর্থাৎ, গতবারের তুলনায় শুধুমাত্র এই জেলাগুলি থেকেই ৫০ লক্ষ টাকারও বেশি অতিরিক্ত বই বিক্রি করেছে সিপিএম। রাজ্য জুড়ে বিভিন্ন মণ্ডপের বাইরে বসা প্রায় ১,২০০টি স্টল থেকে দশমী (২১ অক্টোবর) পর্যন্ত প্রায় ১ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলায়, যেখানে বিক্রির অঙ্ক ১০ লক্ষ টাকা ছাড়িয়েছে। সবচেয়ে বেশি চর্চায় রয়েছে কলকাতার যাদবপুর ৮-বি বাসস্ট্যান্ডের স্টলটি। যেখানে ষষ্ঠীর ঠিক আগে একটি জেসিবি (JCB) বা বুলডোজার নামিয়ে দোকান ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা রুখে দিয়েছিল স্থানীয় আমজনতা ও বাম কর্মীরা, সেখানে গতবার ৪.৫ লক্ষ টাকার বই বিক্রি হলেও এবার দশমীর বিকেলের মধ্যেই তা চার গুণ বেড়ে ১৬ লক্ষ টাকায় পৌঁছেছে! একইভাবে কলকাতার বাঘবাজার সর্বজনীনের স্টলে বিক্রি ১.৫ লক্ষ থেকে বেড়ে ৪.৫ লক্ষ টাকা হয়েছে। বামেদের দাবি, বইয়ের দোকানে এই উপর্যুপরি হামলার ঘটনাই আমজনতার একাংশের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যার ফলে মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাউন্টার থেকে আরও বেশি করে সাহিত্য ও রাজনৈতিক বই কিনে এই গুণ্ডামির জবাব দিয়েছেন।
সিপিএম-এর এই কোটি টাকার বই বিক্রির দাবিকে সম্পূর্ণ অলীক এবং সস্তা রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা বলে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্য। নির্বাচনী ময়দানে বামেদের অপ্রাসঙ্গিকতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি তীব্র কটাক্ষ করে বলেন: “সিপিএম এ রাজ্যে একটি পরীক্ষিত এবং সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত রাজনৈতিক দল। বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে মানুষ ওদের পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনী ময়দানে শূন্য হয়ে গিয়ে এখন তারা উৎসবের মরশুমে বই বিক্রির কাল্পনিক গল্প ফেঁদে রাজনৈতিকভাবে ভেসে থাকার চেষ্টা করছে। এদের কথা শুনলে মনে হয় এরা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছে।” তবে বুকস্টল ভাঙচুরের ঘটনার সঙ্গে রাজ্য বিজেপি কোনোভাবেই যুক্ত নয় বলে দাবি করেছেন শমীকবাবু। তিনি সাফ জানান, সভ্য সমাজে বই ছুড়ে ফেলা বা বিরোধী মতাদর্শের দোকান ভাঙা একেবারেই সমর্থনযোগ্য নয়। যদি কোনো অতি-উত্সাহী কর্মী এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকেন, তবে দল তা বরদাস্ত করবে না।
উল্লেখ্য, পুজোর আগেই বামেদের স্টল নিয়ে কড়া অবস্থান স্পষ্ট করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তিনি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যারা ঈশ্বর বিশ্বাস করে না, সনাতন ধর্মকে মানে না, তারা কেন দুর্গাপুজোর মণ্ডপের বাইরে ‘শারদোৎসব’ লিখে দোকান দেবে? তাঁর স্পষ্ট পরামর্শ ছিল, বামেরা মণ্ডপ চত্বরে স্টল না দিয়ে নিজেদের পার্টি অফিস থেকে বই বিক্রি করুক। যদিও এই বিষয়ে বর্তমান বিজেপি সরকারের অন্দরেই কিছুটা ভিন্ন সুর দেখা গিয়েছে। রাজ্যের প্রবীণ মন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বুকস্টলে ভাঙচুরের এই সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা করেছেন। স্বপন দাশগুপ্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যমে জানান, বামপন্থীদের সঙ্গে তাঁর তীব্র মতাদর্শগত ফারাক রয়েছে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তাঁদের বইয়ের স্টল ভেঙে দেওয়া হবে। এ ধরনের ঘটনা বাংলার কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিপন্থী। সব মিলিয়ে, উৎসবের মরশুম মিটলেও মণ্ডপের বাইরে বাম-ডান বুকস্টলের এই রাজনৈতিক ও আদর্শগত লড়াই আগামী দিনে বাংলার রাজনীতিতে আরও বড় আকার নিতে চলেছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল।
