প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর মহাযুদ্ধের দামামা কি তবে আজ ভবানীপুরের অলি-গলি থেকেই বেজে গেল? শনিবার সকালে কালীঘাট মন্দিরে পুজো দিয়ে বেরিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যে ‘রাজনৈতিক মিসাইল’ ছুঁড়লেন, তার লক্ষ্য সরাসরি তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব। শুভেন্দু আজ স্পষ্ট ভাষায় মুখ্যমন্ত্রীকে পরামর্শ দিয়েছেন, “মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী, আপনি মেটিয়াবুরুজে যান, এখানে আর সুযোগ হবে না।” কিন্তু হঠাৎ কেন ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে মেটিয়াবুরুজের নাম নিলেন নন্দীগ্রামের জয়ী বিধায়ক? এর নেপথ্যে কোন ‘ডেডলি’ অংক কাজ করছে, যা নিয়ে এখন তৃণমূলের অন্দরেও শুরু হয়েছে ফিসফাস? শুভেন্দু অধিকারীর এই আত্মবিশ্বাসের মূলে রয়েছে তিনটি প্রধান গাণিতিক ও কৌশলগত সমীকরণ, যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে শাসক শিবিরের কপালে চিন্তার ভাঁজ চওড়া করতে যথেষ্ট।
২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূলের লিড কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮,২৯১-এ। ২০২১-এর উপনির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেখানে প্রায় ৫৮ হাজার ভোটে জিতেছিলেন, সেখানে এই কয়েক বছরের ব্যবধানে ভোটের এই বিশাল ধস শুভেন্দুর অংকের প্রধান অস্ত্র। শুভেন্দু মনে করছেন, এই ৮ হাজার ভোটের ব্যবধান মুছে ফেলা এখন স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। ভবানীপুর মানেই মিশ্র জনজাতি। এখানে প্রায় ৩৪% ভোটার অ-বাঙালি (শিখ, মাড়োয়ারি, গুজরাটি)। শুভেন্দুর দাবি, সাম্প্রতিক বিভিন্ন ইস্যুতে এই মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ-মধ্যবিত্ত ভোটাররা তৃণমূলের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়েছেন। মেটিয়াবুরুজের নাম নেওয়ার মাধ্যমে তিনি আসলে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে—মুখ্যমন্ত্রী এখন সাধারণ মিশ্র জনজাতির এলাকায় আর নিরাপদ নন, তাঁর একমাত্র ভরসা এখন বিশেষ একটি সংখ্যালঘু প্রধান পকেট। এই গাণিতিক ইঙ্গিতই তৃণমূলের বড় মাথাব্যথা। শুভেন্দু অধিকারী প্রকাশ্যেই দাবি করেছেন যে, গত কয়েক বছরে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে ভবানীপুরের ভোটার তালিকা থেকে প্রচুর ‘ভুয়া ভোটার’ বা ‘ডাবল ভোটার’ বাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে। বিরোধী দলনেতার অংক বলছে, এই ভুয়ো ভোটাররাই ছিল শাসকদলের বড় শক্তির উৎস। সেই রসদ ফুরিয়ে আসতেই এখন ভবানীপুর বিজেপির কাছে ‘নিশ্চিত জয়’ বলে তিনি দাবি করছেন।
কিন্তু মেটিয়াবুরুজই কেন? শুভেন্দুর এই খোঁচা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত। মেটিয়াবুরুজ কলকাতার এমন একটি কেন্দ্র যেখানে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু ভোটব্যাংকের প্রভাব বেশি। মুখ্যমন্ত্রীকে সেখানে যেতে বলার অর্থ হলো—তৃণমূল এখন কেবল একটি নির্দিষ্ট পকেটের ওপর দাঁড়িয়ে টিকে আছে। এই বয়ান তৈরি করে শুভেন্দু আসলে শাসক দলের ‘গণভিত্তি’ নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিতে চাইছেন। নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর পর শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক ওজন বহুগুণ বেড়েছে। তিনি জানেন, ভবানীপুরকে যদি তিনি ‘অনিরাপদ’ প্রমাণ করতে পারেন, তবে গোটা রাজ্যে তৃণমূল কর্মীদের মনোবল ভেঙে পড়বে। আজকের এই হুঙ্কার সেই ‘সাইকোলজিক্যাল ওয়ারফেয়ার’ বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধেরই একটি অংশ।
তৃণমূল নেতৃত্ব এই মন্তব্যকে গুরুত্ব দিতে নারাজ হলেও, অন্দরে অংক কষতে শুরু করেছেন ভোটকুশলীরাও। কারণ, খোদ মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুকে দাঁড়িয়ে শুভেন্দুর এই ‘ডেডলি’ চ্যালেঞ্জ বঙ্গ রাজনীতির সমীকরণ ২০২৬-এর আগে আরও জটিল করে তুলল। লড়াইটা কি তবে এবার ‘ঘরের মেয়ে’ বনাম ‘অংকের জাদুকরের’? উত্তর লুকিয়ে আছে ভবানীপুরের ভোটারদের ইভিএমে।
