প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর মহাযুদ্ধে বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক অভাবনীয় মোড়। যে ভবানীপুরকে গত এক দশক ধরে শাসকদলের অপরাজেয় দুর্গ হিসেবে দেখা হতো, বুধবার সেই গড়েই শোনা গেল পরিবর্তনের এক নতুন প্রতিধ্বনি। ১লা এপ্রিল, ভবানীপুরের অলিগলি যখন শুভেন্দু অধিকারীর পদযাত্রায় গেরুয়া আবহে সেজে উঠেছে, তখনই মাইকে ভেসে এল সেই অমোঘ ঘোষণা— “ভবানীপুরে জিতবে যে, মুখ্যমন্ত্রী হবে সে!” এই একটি স্লোগানই কার্যত এবারের বিধানসভা নির্বাচনের সুর বেঁধে দিল এবং বাংলার মসনদ দখলের লড়াইকে এক নতুন মাত্রা দিল।
এদিন ভবানীপুরের ৭৪ এবং ৮২ নম্বর ওয়ার্ডে শুভেন্দু অধিকারীর প্রচার ছিল চোখে পড়ার মত। কর্মী-সমর্থকদের উপচে পড়া ভিড় আর সাধারণ মানুষের উৎসাহে এটা স্পষ্ট যে, দক্ষিণ কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে এবার পদ্ম শিবিরের জমি যথেষ্ট শক্ত। প্রচারের শুরুতেই মাইকে ঘোষণা করা হয়, “আপনারা অত্যন্ত ভাগ্যবান ভোটার। কারণ আপনাদের ভোটেই ঠিক হবে বাংলার পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী কে হতে চলেছেন।” বিজেপি কর্মীদের দাবি, শুভেন্দু অধিকারী সেই জননেতা যিনি সরাসরি লড়াইয়ের ময়দানে নেমে পরিবর্তনের ডাক দিয়েছেন এবং ২০২১-এ নন্দীগ্রামের মাটিতে অভাবনীয় জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই স্লোগানের আড়ালে রয়েছে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী রণকৌশল। এই স্লোগানটি মূলত শুভেন্দু অধিকারীকে আগামীর ‘মুখ’ হিসেবে তুলে ধরার একটি কৌশল। নন্দীগ্রাম জয়ের পর থেকেই শুভেন্দুর জনপ্রিয়তা গ্রাম থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। এবার ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে তাঁকে ‘হবু মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে তুলে ধরা নিচুতলার বিজেপি কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি করেছে। খোদ শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্বের দীর্ঘদিনের পুরনো কেন্দ্রে গিয়ে ‘নতুন মুখ্যমন্ত্রী’র স্লোগান দেওয়া তৃণমূল শিবিরের ওপর তীব্র মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করার শামিল। এটি সাধারণ ভোটারদের কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিচ্ছে যে, পরিবর্তনের চাকা এবার রাজপথ থেকে শুরু করে অন্দরমহলেও ঘুরতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের একাধিপত্যের পর সাধারণ মানুষের মনে যে বদলের আকাঙ্ক্ষা দানা বেঁধেছে, ভবানীপুরের জনপ্লাবন তারই বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষ এবার এক বলিষ্ঠ ও বিকল্প নেতৃত্বের সন্ধান করছেন, যিনি বাংলার হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
নিজের নামের সঙ্গে ‘মুখ্যমন্ত্রী’ তকমা জুড়ে দেওয়া নিয়ে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অবশ্য যথেষ্ট সংযত ও বিচক্ষণ। তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “বিজেপিতে কোনো ব্যক্তি বড় নয়, দলই শেষ কথা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরা সবাই কাজ করছি। তবে এটা নিশ্চিত যে, ২৯৪ টি আসনের যেকোনো প্রান্ত থেকে জিতে আসা জনদরদী ভূমিপুত্রই এবার বাংলার শাসনভার সামলাবেন। ভবানীপুরের মানুষ এবার এক স্বচ্ছ ও উন্নয়নমুখী সরকার চাইছেন।” তাঁর এই মন্তব্য একদিকে যেমন দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রেখেছে, অন্যদিকে জল্পনাকেও দারুণভাবে জিইয়ে রেখেছে।
শুভেন্দুর প্রচার চলাকালীন তৃণমূল শিবিরের পক্ষ থেকেও পাল্টা স্লোগান শোনা যায়। বেশ কিছু জায়গায় দুই পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বাক্যবিনিময় হলেও বড় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশের কড়া নিরাপত্তা বেষ্টনীতে গণতান্ত্রিক উপায়েই প্রচার চলেছে। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভবানীপুরের এই লড়াই আসলে দুই ভিন্ন মেরুর আদর্শের লড়াই, যেখানে সাধারণ ভোটাররাই শেষ কথা বলবেন। মাইকের ওই ঘোষণাটি বাংলার মানুষের মনে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে— তবে কি এবার ভবানীপুর থেকেই শুরু হতে চলেছে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার চূড়ান্ত অধ্যায়? ২০২৬-এর ফলাফল যাই হোক না কেন, শুভেন্দু অধিকারীকে কেন্দ্র করে এই ব্যাপক উন্মাদনা এটা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, বাংলার রাজনীতিতে তিনি এখন অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র। এখন দেখার, ভবানীপুরের মানুষ এই ‘নতুন মুখ্যমন্ত্রী’র স্লোগানকে ব্যালট বক্সে কতটা সমর্থন দেন।
