প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাংলার রাজনীতির আকাশে আজ আর সেই ‘চাণক্য’ নেই। ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতে মুকুল রায়ের প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গেই যেন উত্তর ২৪ পরগনার রাজনীতির অলিন্দে জমে থাকা এক গভীর আগ্নেয়গিরি সজাগ হয়ে উঠল। আর সেই বিষ্ফোরণ ঘটালেন স্বয়ং মুকুল-পুত্র তথা কাঁচরাপাড়া পৌরসভার উপ-পুরপ্রধান শুভ্রাংশু রায়। “আমি মুকুল রায় নই যে যেখান থেকে খুশি প্রার্থী হব”— তাঁর এই একটি তীক্ষ্ণ বাক্যেই যেন কেঁপে উঠল তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত।
তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মলগ্ন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছায়াসঙ্গী ছিলেন মুকুল রায়। ২০০১ থেকে ২০১১— বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ‘পরিবর্তন’ আনার আসল কারিগর ছিলেন তিনিই। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী, মুকুলের অঙ্গুলিহেলনেই চলত দলের সংগঠন। তাঁকে বলা হতো ‘বাংলার চাণক্য’, যিনি বুথ স্তরের কর্মীর নামও নখদর্পণে রাখতেন। কিন্তু ২০১৭-তে তাঁর বিজেপি গমন এবং ২০২১-এ পুনরায় প্রত্যাবর্তন— এই দোলাচলের মাঝে রায় পরিবারের রাজনৈতিক গুরুত্ব কি তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল? শুভ্রাংশুর সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই সন্দেহই এখন জনসমক্ষে।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের মুখে দাঁড়িয়ে শুভ্রাংশু রায়ের দাবি, দল তাঁকে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্র থেকে লড়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব সপাটে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, তিনি নিজের চেনা জমি অর্থাৎ বীজপুর বা তার সংলগ্ন এলাকা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে রাজি নন। উল্লেখ্য, এবারের নির্বাচনেও বীজপুরে তৃণমূলের বাজি সুবোধ অধিকারীই। শুভ্রাংশু বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাবার মত তিনি ‘যেখানে খুশি’ প্রার্থী হওয়ার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন। নিজের গড়ে ব্রাত্য থেকে অন্য জেলায় গিয়ে ‘প্যারাসুট প্রার্থী’ হওয়া তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে বাধে। তৃণমূলের অন্দরে টিকিট নিয়ে যখন হাহাকার, তখন এই সরাসরি প্রত্যাখ্যান আসলে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের একাধিপত্যের বিরুদ্ধেই এক নীরব চপেটাঘাত।
শুভ্রাংশু রায়ের ক্ষোভ শুধু টিকিট না পাওয়া নিয়ে নয়, বরং প্রশাসনিক স্তরে তাঁর গুরুত্বহীনতা নিয়েও। কাঁচরাপাড়া পৌরসভার উপ-পুরপ্রধানের মত একটি আলঙ্কারিক পদে থেকেও তিনি কার্যত ক্ষমতাহীন। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ, “আমার দফতরগুলির অধিকাংশ কাজই এখন অনলাইনে হয়। ফলে উপ-পুরপ্রধান হিসেবে আলাদা করে কোনো ভূমিকা থাকে না”। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি দাপুটে নেতাদের ক্ষমতা খর্ব করতেই এই ‘ডিজিটাল’ চাল চালছে ঘাসফুল শিবির? প্রশাসনের এই আমলাতান্ত্রিক দাপট আসলে প্রমাণ করে যে, শাসক দলে জনপ্রতিনিধিদের মর্যাদা আজ ধুলোয় মিশেছে। কাজ করার সুযোগ কেড়ে নিয়ে তাঁদের শুধু ‘ভোট মেশিন’ হিসেবে ব্যবহার করার এই কৌশলই কি তবে তৃণমূলের আসল চেহারা?
শুভ্রাংশু জানিয়েছেন তিনি দলের প্রার্থীর হয়ে প্রচার করেছেন, কিন্তু সেই প্রচারে কি কোনো প্রাণ ছিল? মুকুল রায়ের প্রয়াণের পর তাঁর অনুগামীরা আজ অভিভাবকহীন। সেই শূন্যস্থান পূরণ করতেই কি শুভ্রাংশু আজ এতটা সরব? রাজনৈতিক মহলের মতে, বাবার মতো আপোষ না করে শুভ্রাংশু নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় গড়তে চাইছেন। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের রাজনীতিতে যেখানে দলবদলের হাওয়া সবসময়ই তপ্ত থাকে, সেখানে শুভ্রাংশুর এই ‘বেসুরো’ অবস্থান আসন্ন ২৩ এবং ২৯ এপ্রিলের নির্বাচনে শাসক দলের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। মুকুল রায়ের চাণক্য বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে যারা একদা ক্ষমতায় এসেছিল, আজ তাঁর পুত্রের এই ‘বিদ্রোহ’ সেই সিংহাসনের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কাঁচরাপাড়ার অলিগলিতে এখন একটাই আলোচনা— শুভ্রাংশু কি তবে শুধু সময়ের অপেক্ষা করছেন?
