প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-উত্তর কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপের ভয়াবহ পদপিষ্টের ঘটনায় (যাতে ১৯ জনের মৃত্যু হয়েছে) এবার মূল অভিযুক্তকে গ্রেফতার করল কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (DD)। ধৃতের নাম সঞ্জীব রাহা ওরফে সেন্টু, যিনি ওই পূজা কমিটির কোষাধ্যক্ষ (Treasurer) পদে ছিলেন। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) তাঁকে নদিয়া জেলা থেকে প্রথমে আটক করার পর লালবাজার সদর দফতরে এনে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের শেষে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দাবি, মণ্ডপের ভেতর চূড়ান্ত ভিড়ের মাঝে মাইকে তাঁর করা একটি অত্যন্ত “বিভ্রান্তিকর ও ভুয়ো” ঘোষণাই এই মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছিল।
গত ১৭ অক্টোবর (মহা সপ্তমী) রাতে চোরবাগান মণ্ডপে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় ছিল, যার সাথে যোগ হয়েছিল প্রবল বৃষ্টি। মণ্ডপ থেকে বেরোনোর রাস্তাটি ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও লোহার গ্রিলে ঘেরা একটি বৃত্তাকার র্যাম্প। বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে বাইরের মূল গেটে অনেকে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে পড়ায় ভেতরে জট তৈরি হয়। ঠিক এই চরম ভিড়ের মুহূর্তে পুজো কমিটির বসার ঘর থেকে মাইকে আচমকা ঘোষণা করে দেওয়া হয়—”মণ্ডপ ভেঙে যাচ্ছে! আপনারা যে যেখানে আছেন দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান, নাহলে পদপিষ্ট হয়ে যাবেন”।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত ও সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট যে, মণ্ডপ ভেঙে পড়ার মতো কোনও পরিস্থিতি সেদিন তৈরি হয়নি। কিন্তু মাইকের এই ভয়ঙ্কর সতর্কবার্তা শোনা মাত্রই দর্শনার্থীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মানুষ সুশৃঙ্খলভাবে বেরোনোর পরিবর্তে বাঁচতে হুড়োহুড়ি করে সরু র্যাম্পের পথ দিয়ে ছুটতে শুরু করেন। অবরুদ্ধ পথ এবং হুড়োহুড়ির জাঁতাকলে পড়ে মানুষ একে অপরের ওপর আছড়ে পড়েন এবং পদপিষ্ট হয়ে ১৯ জনের করুণ মৃত্যু ঘটে।
সপ্তমীর রাতের এই ঘটনার পর থেকেই বেপাত্তা হয়ে যান পূজা কমিটির কোষাধ্যক্ষ সেন্টু। নিজের মোবাইল ফোন বন্ধ রেখে তিনি এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে লালবাজারের গোয়েন্দারা তাঁর মোবাইল টাওয়ার লোকেশন ট্র্যাক করে জানতে পারেন যে তিনি নদিয়া জেলায় আত্মগোপন করে আছেন। সেখান থেকেই তাঁকে ধরে নিয়ে আসা হয় কলকাতায়। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন—কোনো রকম যাচাই না করে কার নির্দেশে তিনি মাইকে এমন মারাত্মক ও প্ররোচনামূলক ঘোষণা করেছিলেন? এই ঘটনায় যুক্ত অন্য আরেকজন সন্দেহভাজনের খোঁজেও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।
কলকাতা হাইকোর্টের সঙ্গে পরামর্শ করে ইতিমধ্যেই এই ঘটনার তদন্তের জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অনিন্দিতা রায় সরস্বতীর নেতৃত্বে একটি ৬ সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠন করেছে রাজ্য সরকার। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সিট প্রধান দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং জানান যে মণ্ডপে আলোর অভাবও (Poor lighting) এই দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ ছিল। মণ্ডপটি পুরোপুরি খতিয়ে দেখতে থ্রিডি (3D) স্ক্যান ক্যামেরার সাহায্যে পুরো এলাকা নথিভুক্ত করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ইতিমধ্যেই নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং আর্থিক সাহায্য ও দ্রুত তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন। সেন্টুকে নিয়ে এই চাঞ্চল্যকর মামলায় এ পর্যন্ত পূজা কমিটির সম্পাদক রাজকুমার সেওদা এবং সহ-সভাপতি শান্তনু দুবেসহ মোট ৮ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ। ধৃতদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনসহ একাধিক জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা রুজু করে তদন্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
