প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট- বাংলার ভোট-রাজনীতিতে যখনই কোনো অস্বস্তিকর সত্যি সামনে আসে, তখনই ব্যক্তিগত আক্রমণকে ঢাল করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়—রাজনৈতিক মহলে এই ধারণা দীর্ঘদিনের। বৃহস্পতিবার সাগরদিঘির সভা থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বিরুদ্ধে তাঁর রণংদেহী মেজাজ সেই পুরনো কৌশলেরই পুনরাবৃত্তি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলার ‘জনবিন্যাস’ বা ডেমোগ্রাফি পরিবর্তন নিয়ে অমিত শাহের তোলা অভিযোগের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা না দিয়ে, উল্টে তাঁকে ‘অপদার্থ’ বলে পদত্যাগ দাবি করাকে ‘রাজনৈতিক দেউলিয়াপনা’ হিসেবেই দেখছে বিজেপি ঘনিষ্ঠ মহল।
অমিত শাহ বারবার সীমান্ত জেলাগুলোতে অনুপ্রবেশ এবং জনবিন্যাসের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া নিয়ে সরব হয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলার সীমান্ত সংলগ্ন একাধিক ব্লকে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা বৃদ্ধি স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি। সাগরদিঘিতে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বলেন, ‘অমিত শাহ বাংলার ডেমোগ্রাফি জানেন না’, তখন প্রশ্ন ওঠে—তবে কি মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এই রূঢ় বাস্তবকে আড়াল করতে চাইছেন? অনুপ্রবেশকারীদের কি তবে ভোটব্যাংক হিসেবে ব্যবহার করতেই এই সত্য অস্বীকারের রাজনীতি? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইস্তফা দাবি করা কি আসলে সেই ‘অস্বস্তি’ ঢাকারই এক মরিয়া চেষ্টা? মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, অমিত শাহ নাকি নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে বাংলার ডেমোগ্রাফি বদলে দিচ্ছেন। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কাছে এই দাবি শুধু হাস্যকর নয়, বরং বিভ্রান্তিকর। কোনো সাংবিধানিক সংস্থা বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাতারাতি কোনো রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে দিতে পারেন না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যা মূলত অনুপ্রবেশ এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার ফসল। আসলে নির্বাচনী ময়দানে পরাজয় নিশ্চিত বুঝলেই কি এখন কেন্দ্রীয় এজেন্সি বা নির্বাচন কমিশনের ওপর দোষ চাপানোর পুরনো ‘ভিক্টিম কার্ড’ খেলছেন তৃণমূল নেত্রী?
কালিয়াচকের সাম্প্রতিক অশান্তিকে ‘বিজেপির গেম প্ল্যান’ বলে অভিহিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অথচ সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানেই আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, সেখানেই কেন ষড়যন্ত্রের গন্ধ খোঁজে শাসকদল? অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিয়ে বিরোধী দলের ওপর দায় চাপানো কি সুশাসনের লক্ষণ, না কি বিশেষ ভোটব্যাংককে চটানোর ভয়? শান্তিপূর্ণ লড়াইয়ের যে আহ্বান তিনি জানিয়েছেন, তা আদতে কি কর্মীদের চাঙ্গা করার এক প্রচ্ছন্ন প্ররোচনা?
সাগরদিঘির সভা প্রমাণ করে দিল, বিজেপি যে ইস্যুগুলো (অনুপ্রবেশ, জনবিন্যাস পরিবর্তন) সামনে আনছে, তাতে তৃণমূলের অন্দরে কম্পন শুরু হয়েছে। গঠনমূলক বিতর্কে না গিয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা আসলে তর্কের খাতিরে তর্কে জেতার চেষ্টা মাত্র। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো নেত্রী ব্যক্তিগত আক্রমণ ও পদত্যাগের দাবিতে সরব হন, তখন বুঝতে হবে ইস্যুভিত্তিক লড়াইয়ে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছেন। বাংলার সচেতন ভোটাররা কি এই ‘অপদার্থ’ তত্ত্ব আর ষড়যন্ত্রের তত্ত্বে ভুলবেন, নাকি ডেমোগ্রাফি পরিবর্তনের আসল সত্যিটা বুঝে নিয়েছেন? সময় তার উত্তর দেবে।
