প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-এই বাংলায় টাকা উদ্ধারের ঘটনা এখন আর কোনো রূপকথা নয়, বরং এক আদিম ও জলজ্যান্ত বাস্তব। কখনও কোনো প্রভাবশালী নেতার বান্ধবীর ফ্ল্যাট, কখনও আবার সরকারি আমলার তোশকের তলা থেকে বান্ডিল বান্ডিল নোট বেরোতে দেখেছে আমজনতা। কিন্তু এবার দুর্নীতির কালো টাকা লুকিয়ে রাখার যে অকল্পনীয় ‘সেফ হাউস’ সামনে এলো, তা দেখে ঝানু গোয়েন্দাদেরও চক্ষু চড়কগাছ। পশ্চিম বর্ধমানের শিল্পাঞ্চল দুর্গাপুরের এক নির্জন, পরিত্যক্ত ইটভাটার ভাঙা ঘর থেকে উদ্ধার হলো থরে থরে সাজানো নগদ ৪৮ লক্ষ টাকা! খনি ও ইস্পাত নগরীর উপকণ্ঠে এই পরিত্যক্ত ইটভাটার অন্ধকূপে কারা কীভাবে এমন ‘ম্যালেরিয়া’র মতো টাকার স্তূপ জমিয়ে রেখেছিল, তা নিয়ে এখন তোলপাড় গোটা রাজ্য।
পুলিশ সূত্রে খবর, বেশ কিছুদিন ধরেই দুর্গাপুরের এই জনমানবহীন, জঙ্গলঘেরা পরিত্যক্ত ইটভাটার আশেপাশে কিছু সন্দেহভাজন মানুষের আনাগোনার খবর আসছিল। গোপন সূত্রে পাকা খবর পেয়ে আসানসোল-দুর্গাপুর পুলিশ কমিশনারেটের একটি বিশেষ দল গতকাল রাতে ওই ইটভাটায় অতর্কিতে হানা দেয়। ভাটার ভেতরে একটি ভাঙা, স্যাঁতসেঁতে ঘরের দরজা খুলতেই ছিটকে যান তদন্তকারীরা। ঘরের এক কোণে বস্তাবন্দি অবস্থায় স্তূপ করে রাখা রয়েছে ৫০০ এবং ১০০ টাকার নোটের বান্ডিল! গভীর রাত পর্যন্ত কাউন্টিং মেশিন এনে গোনার পর দেখা যায়, উদ্ধার হওয়া টাকার পরিমাণ ঠিক ৪৮ লক্ষ টাকা। এই বিপুল টাকা বাজেয়াপ্ত করার পাশাপাশি পুলিশ ওই পুরো এলাকাটি সিল করে দিয়েছে।
ক্যামেরা নেই, দারোয়ান নেই, একটা জরাজীর্ণ পরিত্যক্ত ঘরের ভেতর এতগুলো টাকা ফেলে রাখার মতো অসীম সাহস কার হতে পারে? এই ৪৮ লক্ষ টাকা কি কেবলই হিমশৈলের চূড়ামাত্র?প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ ও আয়কর বিভাগের আধিকারিকদের অনুমান, এই টাকা কোনো সাধারণ চুরির ধন নয়। শিল্পাঞ্চলে বালি, কয়লা কিংবা স্ক্র্যাপ লোহার সিন্ডিকেট রাজের ‘কাটমানি’র বড় কোনো কিস্তিই এখানে সাময়িকভাবে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলার কড়াকড়ি এড়াতে এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির নজরদারিকে ফাঁকি দিতেই কি কোনো রাঘববোয়াল এই পরিত্যক্ত ইটভাটাকে তাঁর টাকার গোপন ব্যাংক বানিয়ে ফেলেছিলেন? ঘটনার পর থেকেই ওই এলাকার একাধিক সিন্ডিকেট অপারেটর ও বেআইনি কারবারিরা গা ঢাকা দিয়েছে, যা এই সন্দেহকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনার তদন্তে নেমে ওই ইটভাটার মালিক এবং আশেপাশের গ্রামবাসীদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে। সিসিটিভি ফুটেজ না থাকায়, ওই রাস্তায় গত কয়েকদিনে কোন কোন বিলাসবহুল গাড়ি যাতায়াত করেছে, তার একটি তালিকা তৈরি করছে গোয়েন্দা বিভাগ। রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন সরকার যেখানে দুর্নীতিমুক্ত এবং স্বচ্ছ শাসনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, সেখানে শিল্পাঞ্চলের খোদ পরিত্যক্ত ঘরের ভেতর এমন টাকার পাহাড় উদ্ধার হওয়াটা এক মস্ত বড় প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ। এই ৪৮ লক্ষ টাকার উৎস কী, তা পুলিশ সত্যিই খুঁজে বের করতে পারবে, নাকি বরাবরের মতোই সর্ষের ভেতরের ভূত আড়াল করতে পুরো বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যাবে—তার উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ। তবে দুর্গাপুরের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল, উপরি আয়ের কালো টাকা লুকানোর জন্য বাংলার মাটির তলাতেও এখন ‘গুপ্তধন’ খোঁজার সময় এসেছে।
