প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বাংলার রাজনীতিতে কি তবে সব আদর্শের অবসান হতে চলেছে? যে বামপন্থীদের ‘হার্মাদ’ ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ তকমা দিয়ে দীর্ঘ ৩৪ বছরের শাসনের পতন ঘটিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, আজ নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব সংকটে পড়তেই সেই চরম শত্রুদেরই পাশে দাঁড়ানোর করুণ আর্তি জানালেন তিনি? মঙ্গলবার তৃণমূল নেত্রীর এই নজিরবিহীন ‘রাজনৈতিক ডিগবাজি’ দেখে রাজনৈতিক মহলে তীব্র চর্চা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে হারের আতঙ্কেই এই নীতিহীন জোটের স্বপ্ন দেখছেন তিনি?
ঘটনার সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের একটি পুরনো প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি নিয়ে। যেখানে কেরল ইউনিটের একটি সাধারণ ‘ক্লারিকাল মিস্টেক’ বা টাইপিং ত্রুটির কারণে একটি সিল সংক্রান্ত বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। কমিশন ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করেছে যে এটি একটি অনিচ্ছাকৃত মানবিক ভুল এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সামান্য বিষয়কে খড়কুটোর মতো আঁকড়ে ধরে ‘বিরাট চক্রান্ত’ হিসেবে খাড়া করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী। উত্তরবঙ্গ সফরে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দাবি করেন, “থলে থেকে বিড়াল বেরিয়ে পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞপ্তিতে বিজেপির রাবার স্ট্যাম্প থাকার অর্থ হলো কমিশনকে পিছন থেকে বিজেপিই চালাচ্ছে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নিজের দলের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ এবং জনরোষ থেকে নজর ঘোরাতেই এখন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করছেন তৃণমূল নেত্রী।
এদিন মমতার বক্তব্যের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অংশ ছিল তাঁর ‘ঐক্যের ডাক’। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “কে বাম, কে ডান ভুলে যান। একজোট হয়ে লড়াই করুন।” যে নেত্রী একসময় বলেছিলেন ‘সিপিএম-এর সঙ্গে ঘর করা পাপ’, আজ তিনিই অস্তিত্ব বাঁচাতে সেই বামপন্থীদেরই জোটসঙ্গী হওয়ার করুণ প্রস্তাব দিচ্ছেন। বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, একসময় যাঁদের ঘরছাড়া করেছিলেন, আজ ক্ষমতার লোভে তাঁদেরই বন্ধু বলছেন—এর চেয়ে বড় রাজনৈতিক দ্বিচারিতা আর হয় না।
ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, তবে কি বাংলায় তৃণমূলের পায়ের তলায় মাটি এতটাই আলগা হয়ে গিয়েছে যে এখন বাম-ডান সব এক করে ‘খিচুড়ি জোট’ গড়ার স্বপ্ন দেখতে হচ্ছে? দুর্নীতিতে নাম জড়ানো দলের নেতাদের বাঁচাতে এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির তদন্ত রুখতেই কি এই মরিয়া চেষ্টা?
মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যকে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছে বিজেপি। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “ভোট এলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘গণতন্ত্র গেল’ বলে কান্নাকাটি শুরু করেন। অথচ তাঁর রাজত্বেই বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে রক্তের গঙ্গা বয়ে গিয়েছিল বাংলায়।” যিনি নিজের রাজ্যে বিরোধীশূন্য ভোট করানোর চেষ্টা করেন, তাঁর মুখে নিরপেক্ষতার কথা মানায় না বলেই মনে করছে বিজেপি নেতৃত্ব।
বিজেপির দাবি, মানুষ এখন নরেন্দ্র মোদীর উন্নয়ন এবং ডবল ইঞ্জিন সরকারের অপেক্ষায় দিন গুনছে। সেই মোদী-ঝড়ের সামনে এবং সন্দেশখালির মত ঘটনার পর রাজ্যের মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন দিশেহারা। আর সেই দিশেহারা ভাব থেকেই চিরশত্রু বামপন্থীদের হাত ধরার এই নজিরবিহীন আবেদন।
সব মিলিয়ে, কমিশনের একটি সামান্য ভুলকে হাতিয়ার করে বামেদের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার্যত স্বীকার করে নিলেন যে, আসন্ন লড়াইয়ে তৃণমূল আর একক শক্তিতে লড়তে সক্ষম নয়। আদর্শ বিসর্জন দিয়ে এই যে ‘রাজনৈতিক সার্কাস’ তিনি শুরু করেছেন, বাংলার সচেতন মানুষ তার জবাব ব্যালট বক্সেই দেবে—এমনটাই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
