প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত তিন দশক ধরে ‘জোড়াফুল’ প্রতীকটি কেবল একটি রাজনৈতিক চিহ্ন ছিল না, বরং তা ছিল গ্রামীণ বাংলার কোটি কোটি মানুষের কাছে এক অমোঘ আবেগ এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমার্থক। কিন্তু নির্বাচন কমিশন (ECI) কর্তৃক সেই প্রতীক ফ্রিজ বা সাময়িকভাবে বাজেয়াপ্ত করার পর, আসন্ন উপনির্বাচনে বাংলার নির্বাচনী ময়দানে তৈরি হয়েছে এক নজিরবিহীন মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক শূন্যতা। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নতুন প্রতীক ‘ফুটবল খেলোয়াড়’, অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ‘খাম’ বা এনভেলাপ প্রতীক। এই দুই নতুন প্রতীকের দ্বৈরথ কেবল দুটি আসনের উপনির্বাচন নয়, বরং বাংলার নিচু তলার ভোটব্যাংকের মনস্তত্ত্বকে এক চরম পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ভারতের নির্বাচনী ইতিহাস (psephology) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারতের গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে ভোটব্যাংক মূলত ‘প্রতীক-নির্ভর’, ‘নাম-নির্ভর’ নয়। ভোটারদের একটি বিশাল অংশ, বিশেষ করে প্রবীণ ও কম শিক্ষিত নাগরিকরা, বুথের ভেতরে ঢুকে প্রার্থীর নাম পড়ার চেয়ে চেনা প্রতীকের পাশের বোতামটি টিপতেই অভ্যস্ত।১৯৯৮ সাল থেকে ভোটাররা জানেন ‘মমতা মানেই জোড়াফুল’। হঠাৎ ইভিএম মেশিনে সেই চেনা জোড়াফুলের অনুপস্থিতি ভোটারদের মনে প্রথম যে ধাক্কাটি দেবে, তা হলো ‘বিভ্রান্তি’। নতুন প্রতীক ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ মানুষের মাথায় ঢোকাতে মমতা শিবিরের হাতে সময় অত্যন্ত কম। বুথ স্তর পর্যন্ত প্রতিটা কর্মীর বাড়ি বাড়ি গিয়ে বোঝানো যে—”এবার আর ফুলে নয়, ফুটবলে ভোট দিন”—সাংগঠনিকভাবে একটি অত্যন্ত দুরূহ কাজ। কাকতালীয় বা কৌশলগতভাবে, বিদ্রোহী ঋতব্রত-অরূপ রায় শিবির যে ‘খাম’ (Envelope) প্রতীকটি পেয়েছে, তার একটি প্রচ্ছন্ন গ্রামীণ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। গ্রামীণ মানুষের কাছে ‘খাম’ মানেই কোনো সরকারি চিঠি, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের স্বীকৃতিপত্র, বা কোনো সুযোগ-সুবিধার বার্তা। বিদ্রোহী শিবির প্রচারের ময়দানে এই যুক্তি খাড়া করতে পারে যে, আসল দল বা আসল খামটি তাঁদের কাছেই রয়েছে। ফলে ইভিএম-এ চেনা প্রতীক না পেয়ে গ্রামীণ ভোটারদের একটা অংশ যদি বিভ্রান্ত হয়ে ‘খাম’ চিহ্নে বোতাম টিপে দেয়, তবে তা সরাসরি মমতা শিবিরের ভোটব্যাংকে থাবা বসাবে।
একটি রাজনৈতিক দলের মূল চালিকাশক্তি হলো তার দেওয়াল লিখন এবং নিচু তলার কর্মী (Grassroot Workers)। প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার পর আদি তৃণমূল কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ‘পরিচয় সংকট’ (Identity Crisis) তৈরি হয়েছে।দেওয়াল লিখনের সংকট: এতকাল যে কর্মীরা ঘাসফুল আঁকায় দক্ষ ছিলেন, তাঁদের এখন আঁকতে হচ্ছে ফুটবল বা খাম। এটি নিচু তলার কর্মীদের মানসিক উদ্যমে বড় ধাক্কা দিয়েছে। যেহেতু রাজ্যে এখন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় রয়েছে, তাই নিচু তলার কর্মীদের ওপর কালীঘাটের সেই পুরনো প্রশাসনিক রাশ বা ভয় আর নেই। এই প্রতীকহীন অবস্থায় কর্মীরা ভাবছেন, কার পতাকার নিচে দাঁড়ানো নিরাপদ? ‘ফুটবল’-এর আবেগ নাকি ক্ষমতার অলিন্দে থাকা ঋতব্রতদের ‘খাম’? এই দোলাচল গ্রামীণ বুথ স্তরে দলের রাশ আলগা করে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে ১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী যখন চেনা ‘গাই-বাছুর’ প্রতীক হারিয়ে ‘হাত’ প্রতীক পান, তখন তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমা কাজ করেছিল। আবার অতি সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে উদ্ধব ঠাকরে ‘ধনুক-বাণ’ হারিয়ে ‘মশাল’ প্রতীক নিয়ে মানুষের সহানুভূতি পেয়েছিলেন। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ‘আক্রান্ত’ বা ‘সহানুভূতি’ কার্ড খেলার চেষ্টা করলেও, নবান্নে নতুন বিজেপি সরকারের দুর্নীতিবিরোধী কড়া অবস্থান ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের কারণে সাধারণ মানুষের মনোযোগ এখন ক্ষমতার বাস্তবতার দিকে। ফলে শুধু ‘মমতা’ নামের আবেগ দিয়ে এই প্রতীক পরিবর্তনের মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা কতটা সামাল দেওয়া যাবে, তা নিয়ে খোদ আদি শিবিরের অন্দরেই সংশয় তৈরি হয়েছে।
৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে ইভিএম মেশিনের বোতাম নির্ধারণ করবে, বাংলার মানুষ প্রতীকের চেনা আবেগে ভোট দেয়, নাকি নেত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে নতুন প্রতীককে আপন করে নেয়। তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, জোড়াফুলের বিদায় গ্রামীণ বাংলায় আদি তৃণমূলের ভোটব্যাংকের দেওয়ালে এক বড় ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে, যার সুবিধা নিতে তৈরি অন্য সব পক্ষই।
