প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
ভোট যত এগোচ্ছে, ততই যেন তৃণমূলের অন্দরের কঙ্কালসার চেহারাটা প্রকট হয়ে পড়ছে। সোমবার পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জনসভা ছিল রাজনৈতিক মহলের আতশিকাঁচের তলায়। প্রত্যাশামতই, উন্নয়নের খতিয়ানের চেয়েও মমতার বক্তব্যে বেশি জায়গা করে নিল দলের অন্দরের বিদ্রোহ দমনের মরিয়া চেষ্টা। টিকিট না পাওয়া ক্ষুব্ধ নেতাদের শান্ত করতে এদিন মমতার গলায় যে সুর শোনা গেল, তাকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘হতাশার আর্তি’ হিসেবেই দেখছেন।
পাঁশকুড়ার মঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সাফাইয়ের সুরে বলেন, “অনেক জায়গাতে আমরা আগের প্রার্থীকে টিকিট দিতে পারিনি। কারণ কখনও কখনও বদলাতে হয়।” প্রশ্ন উঠছে, এই বদল কি সত্যিই স্বচ্ছ ভাবমূর্তি আনার জন্য? নাকি গত পাঁচ বছরে নিচুতলার কর্মীদের ওপর হওয়া অত্যাচার আর পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির দায় ঝেড়ে ফেলতে পুরনো মুখগুলোকে বলির পাঁঠা করা হচ্ছে? রাজনৈতিক মহলের মতে, বহু আসনেই পুরনো বিধায়কদের বিরুদ্ধে জনরোষ এতটাই তুঙ্গে যে, তাদের টিকিট দিলে জামানত জব্দ হওয়ার ভয় ছিল। সেই ভয় থেকেই এই ‘পরিবর্তন’-এর নাটক।
মমতা এদিন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেন, “যদি কেউ মনে করেন, আজীবন আমি একা থাকব, আর কেউ থাকবে না, এটা মনে করা ভুল। সবাইকে নিয়ে চলতে হবে। দলটা সবার জন্য।” নেত্রীর এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে দিচ্ছে যে তৃণমূল এখন আড়াআড়ি বিভক্ত। একদল নেতা মনে করছেন দলটা তাদের পৈত্রিক সম্পত্তি, অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের সঙ্গে তাদের সংঘাত চরমে। পাঁশকুড়ার মাটিতে দাঁড়িয়ে মমতার এই মন্তব্য আসলে সেই সমস্ত ‘দাদাদের’ প্রতি কড়া বার্তা, যারা টিকিট না পেয়ে নির্দল হয়ে দাঁড়ানোর বা অন্তর্ঘাত করার ছক কষছেন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিল মমতার অনুনয় মাখা আবেদন। তিনি বলেন, “সম্মান দিয়েই বলছি, ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করুন, টিকিট পাননি বলে এমন নয় যে বিরোধিতা করতে হবে।” বিজেপি শিবিরের কটাক্ষ, যে নেত্রী একসময় বিরোধীশূন্য বাংলার ডাক দিতেন, আজ তাকে নিজের দলের কর্মীদের কাছেই হাতজোড় করে ‘ঐক্যের’ ভিক্ষা চাইতে হচ্ছে। এর থেকেই পরিষ্কার যে, তৃণমূলের পায়ের তলার মাটি সরে গিয়েছে। টিকিট না পাওয়া নেতারা এখন ঘাসফুল শিবিরের কাছে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মেদিনীপুরের মত জায়গায়, যেখানে অধিকারী গড়ে তৃণমূল এমনিতেই কোণঠাসা, সেখানে এই অন্তর্কলহ পদ্ম শিবিরের জয়ের পথ আরও প্রশস্ত করছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
মমতা দাবি করেছেন, “ভাল কাজ করুন, টিকিট পাবেন… আর যে মানুষের কাজ করবেন না, দলকে তো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” বিজেপির প্রশ্ন, গত এক দশকে যখন বালি চুরি, কয়লা পাচার আর শিক্ষক নিয়োগ কেলেঙ্কারিতে তৃণমূলের রথী-মহারথীরা জেল খাটছেন, তখন দল কেন ‘সিদ্ধান্ত’ নেয়নি? আজ ভোটের মুখে মানুষের কাজের দোহাই দেওয়া কি নিছকই নির্বাচনী গিমিক নয়? পাঁশকুড়ার সাধারণ মানুষের মনেও প্রশ্ন জাগছে—যারা গত পাঁচ বছর দেখা দেননি, টিকিট বদলালেই কি তাদের অপকর্মের ইতিহাস মুছে যাবে?
পাঁশকুড়ার এই সভা আদতে তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ অগ্নুৎপাত নেভানোর একটি ব্যর্থ চেষ্টা হিসেবেই চিহ্নিত হবে। একদিকে মমতা বলছেন দল সবার জন্য, অন্যদিকে টিকিট না পাওয়া নেতাদের বিদ্রোহ সামাল দিতে ‘সম্মান’ দেওয়ার টোপ দিচ্ছেন। এই দ্বিচারিতাই প্রমাণ করে যে শাসকদলের অন্দরে এখন চরম বিশৃঙ্খলা। রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, মমতার এই ‘টিকিট-তত্ত্ব’ আসলে ডুবন্ত নৌকার মাঝির শেষ চিৎকার। মেদিনীপুরের সচেতন ভোটাররা এই ‘মুখ বদল’-এর রাজনীতিতে ভোলে কি না, সেটাই এখন দেখার। তবে পাঁশকুড়ার মঞ্চ থেকে মমতার এই ভাষণ যে বিজেপির পালে হাওয়া বাড়িয়ে দিল, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
