প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে পাখির চোখ করে এখন থেকেই ঘর গোছাতে শুরু করেছে রাজনৈতিক দলগুলো। তবে ভোটের ময়দানে রাজনীতির লড়াইয়ের পাশাপাশি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় আইন-শৃঙ্খলারক্ষা। বিশেষ করে পশ্চিম মেদিনীপুরের মত সংবেদনশীল জেলায় অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সুনিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে এক কঠিন পরীক্ষা। সেই পরীক্ষাতেই পাস করতে এবার কোমর বেঁধে ময়দানে নামলেন জেলার নবনিযুক্ত পুলিশ সুপার (SP) পাপিয়া সুলতানা। জেলায় পা রেখেই তিনি দুষ্কৃতীদের উদ্দেশ্যে এমন এক কড়া বার্তা দিলেন, যা গত কয়েক বছরে জেলায় শোনা যায়নি। তাঁর সাফ কথা— “অশান্তি করলে পার পাওয়া যাবে না, হয় এলাকা ছাড়ো, নয়তো অশান্তি করা ভুলে যাও।”
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে জেলায় ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় আধা-সামরিক বাহিনীর জওয়ানরা আসতে শুরু করেছেন। সাধারণত দেখা যায়, এলাকায় এসেও অনেক সময় সঠিক নির্দেশিকার অভাবে জওয়ানরা হাত গুটিয়ে বসে থাকেন। কিন্তু পাপিয়া সুলতানা জওয়ানদের মনোবল বৃদ্ধিতে কোনও খামতি রাখছেন না। জওয়ানদের সঙ্গে এক বৈঠকে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, নির্বাচনের সময় পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীই হলো আসল শক্তি। তিনি জওয়ানদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আমরা আর আপনারাই আছি। এলাকা দখল বা ভোটারদের ভয় দেখানো— এই সব অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। আপনাদের উপস্থিতি যেন দুষ্কৃতীদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করে আর সাধারণ মানুষের মনে সাহস জোগায়।” এসপি-র এই নির্দেশিকা থেকে পরিষ্কার যে, এবার কেন্দ্রীয় বাহিনীকে শুধুমাত্র বুথ পাহারায় নয়, বরং দুষ্কৃতী দমনেও ‘ফ্রি-হ্যান্ড’ দিতে চাইছে জেলা প্রশাসন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, ভোটারদের আস্থা ফেরাতে প্রতিদিন নিয়ম করে পাড়ায় পাড়ায় রুট মার্চ করতে হবে। জওয়ানদের সাধারণ মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে হবে যাতে তাঁরা বুঝতে পারেন যে প্রশাসন তাঁদের নিরাপত্তার জন্য সদা জাগ্রত।
পশ্চিম মেদিনীপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ভোটের আগে অনেক এলাকাতেই সাধারণ ভোটারদের ভয় দেখিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখার চেষ্টা চলে। এই ‘ভীতি প্রদর্শন’ রুখতে এবার ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন এসপি। তিনি সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে খোলাখুলি জানিয়েছেন, “কোনো রাজনৈতিক চাপ বা ভয় দেখানোর ঘটনা ঘটলে সরাসরি পুলিশকে জানান।” অভিযোগ জানানোর সুবিধার্থে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট হেল্পলাইন নম্বর এবং এসপি-র দপ্তরের নম্বরও প্রকাশ্যে আনা হয়েছে।
এসপি-র বার্তা অনুযায়ী, ভোটারদের নিরাপত্তার জন্য বুথ স্তরে বিশেষ মোবাইল টিম তৈরি করা হচ্ছে। কোনো গ্রাম বা ওয়ার্ডে যদি কেউ অশান্তি করার চেষ্টা করে, তবে খবর পাওয়া মাত্রই সেখানে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী হাজির হবে। এসপি নিজে জানিয়েছেন, “আপনাদের জন্য ফোন নম্বর দেওয়া আছে। কোনও সমস্যা হলেই জানান, আমরা ব্যবস্থা নেব।”
জেলার এই নতুন এসপি-র পদক্ষেপে স্থানীয় বিজেপি ঘনিষ্ঠ মহল ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে। তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, পুলিশের একাংশের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগ নিয়ে সমাজবিরোধীরা দাপিয়ে বেড়ায়। তবে পাপিয়া সুলতানার এই ‘অ্যাকশন মোড’ সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। সম্প্রতি দায়িত্বভার গ্রহণ করার পর থেকেই জেলার প্রতিটি থানা এবং বুথস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিজে খতিয়ে দেখছেন তিনি। রাজনৈতিক মিছিল-মিটিংয়ের ওপর কড়া নজরদারি, নাকা চেকিং এবং অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে পুলিশের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মত বেড়েছে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬-এর যুদ্ধের আগে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা পুলিশের এই কড়া অবস্থান রাজ্যের অন্যান্য জেলার জন্য একটি উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার, এসপি-র এই “অশান্তি ছাড়ো নয়তো এলাকা ছাড়ো” হুঁশিয়ারি ভোটের ময়দানে কতটা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়।
