প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-লোকসভায় এনসিপিআই-মডেল (NCPI-model), লোকদেখানো ‘ঋতব্রত-মডেল’ কিংবা রাজ্যসভায় দলবদলের খেলা—বিজেপির ক্ষমতার অলিন্দে পৌঁছানোর চেনা কৌশলে এবার যুক্ত হলো আরও এক নজিরবিহীন অধ্যায়। নদীয়া জেলা পরিষদে মাত্র ৬ জন সদস্য থাকা সত্ত্বেও তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ অংশের প্রকাশ্য সমর্থনে যেভাবে বিজেপি ক্ষমতা দখল করল, তা দেখে রাজনৈতিক মহলের এখন একটাই প্রশ্ন—এটা কি তবে ‘বিজেপির তৃণমূলীকরণ’-এর চূড়ান্ত রূপ? ক্ষমতার লোভে আদর্শকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে নিচুতলার পঞ্চায়েত ও গ্রামীণ স্তরে কি এবার এই নীতিহীন দলবদলকেই নতুন রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজি বানাতে চলেছে গেরুয়া শিবির?
যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, তোলাবাজি ও সিন্ডিকেট রাজের অভিযোগ তুলে বিজেপি রাজ্যে পরিবর্তন এনেছে, আজ ক্ষমতার মসনদ নিষ্কণ্টক করতে সেই তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ নেতাদেরই কাঁধে চড়ে নিচুতলা দখল করতে নেমেছে তারা। নদীয়া জেলা পরিষদের ৫২টি আসনের মধ্যে যেখানে একক শক্তিতে বোর্ড গড়ার কোনো যোগ্যতাই বিজেপির ছিল না, সেখানে তৃণমূলের ভেতরের আদি-নব্য কোন্দলকে কাজে লাগিয়ে, তাদেরই ১৫ জন বিক্ষুব্ধ সদস্যের তথাকথিত ‘বিবেক ভোট’ বা ক্রস-ভোটিং পকেটে পুরে সভাধিপতি পদ ছিনিয়ে নিল বিজেপি।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটা কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক জয় নয়; বরং ক্ষমতার চরম সুবিধাবাদ। সাধারণ মানুষ যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে পরিবর্তন এনেছিল, বিজেপি ঘুরপথে সেই দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার শরিকদের হাত ধরেই পঞ্চায়েতের রাশ নিজেদের হাতে রাখছে। একেই বিরোধীরা ‘ঘুরপথে তৃণমূলীকরণ’ বলে তীব্র আক্রমণ শানাচ্ছেন।
নদীয়া জেলা পরিষদের এই ঘটনার পর নিচুতলার গ্রামীণ রাজনীতিতে এক বিপজ্জনক ট্রেন্ডের আভাস মিলছে। দলত্যাগ বিরোধী আইনের ফাঁক গলে সরাসরি দলবদল না করে, দলের ভেতরে থেকে ‘বিবেকের ভোট’ দেওয়ার এই নতুন ‘নদীয়া মডেল’ আগামী দিনে মালদা, মুর্শিদাবাদ বা দুই ২৪ পরগনার মতো জেলাগুলিতেও ব্যাপক হারে ছড়াতে পারে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পঞ্চায়েত ও পুরসভা স্তরে যেখানেই বিজেপি বা তৃণমূলের অন্দরে ফাটল দেখা দেবে, সেখানেই নীতি-আদর্শের তোয়াক্কা না করে ক্ষমতার বৃত্তে টিকে থাকতে মেগা দলবদলের খেলা শুরু হবে। সাধারণ কর্মীরা যখন বুথ স্তরে মার খাচ্ছেন বা রাজনৈতিক লড়াই লড়ছেন, তখন জেলা স্তরের নেতারা এভাবে গোপন আঁতাত বা প্রকাশ্য সমঝোতা করে ক্ষমতার ভাগাভাগি করছেন—যা নিচুতলার রাজনীতির মেরুদণ্ডকেই ভেঙে দিচ্ছে।
বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব যতই এই ঘটনাকে ‘দুর্নীতিমুক্ত শাসনের পক্ষে স্বতঃস্ফূর্ত রায়’ বলে ঢাক পেটানোর চেষ্টা করুক না কেন, রাজনীতির অলিন্দে এই দ্বিচারিতা ঢাকা দেওয়া যাচ্ছে না। একদিকে কলকাতায় বসে তৃণমূলের সংস্কৃতির তীব্র সমালোচনা, আর অন্যদিকে জেলা স্তরে সেই তৃণমূলেরই বিক্ষুব্ধ অংশকে মালা পরিয়ে বরণ করে নেওয়া—বিজেপির এই দুমুখো নীতি নিচুতলার কট্টরপন্থী কর্মীদের মধ্যেই তীব্র ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। নদীয়া জেলা পরিষদ দখল স্রেফ একটি ট্রেলার হতে পারে, কিন্তু ক্ষমতার জন্য আদর্শ বিক্রির এই খেলা আগামী দিনে বাংলার গ্রামীণ রাজনীতিকে এক গভীর নৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দেবে, তা বলাই বাহুল্য।
