প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
গণতন্ত্রের উৎসবে যখন উন্নয়নের খতিয়ান নিয়ে মানুষের দুয়ারে যাওয়ার কথা, তখন খোদ রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের কণ্ঠে শোনা গেল এক চরম অস্থিরতা আর আশঙ্কার সুর। শুক্রবার তৃণমূলের নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশের মঞ্চটি শেষ পর্যন্ত রূপান্তরিত হলো কেন্দ্রীয় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে এক ‘রাজনৈতিক রণক্ষেত্রে’।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইশতেহারের ১০টি অঙ্গীকারের চেয়েও মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণে অনেক বেশি প্রকট হয়ে উঠল ‘কেন্দ্রীয় এজেন্সি’ আর ‘কেন্দ্রীয় বাহিনী’র আতঙ্ক। এদিন মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে, নির্বাচন কমিশন নাকি বিজেপি ও দিল্লির অঙ্গুলিহেলনে চলছে। মোদী-শাহের দপ্তর থেকে ফোনে পুলিশ ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার যে দাবি তিনি করেছেন, তার সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পেশ করা হয়নি। প্রশ্ন উঠছে, তবে কি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে কমিশনের প্রশাসনিক রদবদলই শাসক শিবিরের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে? নিয়ম মেনে চলা একটি সাংবিধানিক সংস্থাকে এভাবে আক্রমণ করা কি আদতে আইনি ব্যবস্থার ওপর অনাস্থা জ্ঞাপন নয়?
রাজ্যে ২০ লক্ষ জওয়ান মোতায়েন এবং তাঁদের থাকা-খাওয়ার বিপুল খরচ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্বেগ সাধারণ মানুষকে অবাক করেছে। যেখানে বুথে বুথে শান্তিতে ভোট দান নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী সাধারণ মানুষের ভরসা, সেখানে মুখ্যমন্ত্রী কেন তাঁদের ‘ছাপ্পা ভোটের কারিগর’ হিসেবে দেখছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিরোধী শিবির। রান্নার গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়া বা হোটেলের টাকা কে দেবে—এমন মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি কি আসলে বাহিনীর কড়া নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছেন? পর্যবেক্ষকদের মতে, জওয়ানদের প্রতি এই বিরূপ মনোভাব কি পরোক্ষভাবে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরিরই নামান্তর? প্রতিটি নির্বাচনের আগেই ইভিএম বিকল বা হ্যাক হওয়ার তত্ত্ব খাড়া করা তৃণমূলের চেনা কৌশল। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীরা বাংলায় এসে ডেরা গেড়েছেন এবং সীমান্ত দিয়ে টাকা আমদানি করছেন—এমন দাবি তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি নিজের সাংগঠনিক ব্যর্থতা ঢাকতে চাইছেন? বর্ডার পাহারা দেওয়ার দায়িত্ব যখন বিএসএফ-এর, তখন মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য কি কেন্দ্রীয় নিরাপত্তারক্ষীদের কর্মদক্ষতা নিয়ে অহেতুক সংশয় তৈরি করছে না? রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, জনসমর্থন আলগা হতেই ‘বহিরাগত’ তকমা দিয়ে আবেগ উসকে দেওয়ার শেষ চেষ্টা করছেন তিনি।
ইডি, সিবিআই এবং এসপিজি সুরক্ষা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যে এক প্রকার হাহাকার ফুটে উঠেছে। একদিকে তিনি দাবি করছেন, বিজেপি ভয় পেয়েছে, অন্যদিকে তাঁর নিজের ভাষণেই ধরা পড়ছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির ধরপাকড় নিয়ে তীব্র অস্বস্তি। ইশতেহারের মাধ্যমে নতুন কোনো দিশা দেখানোর চেয়েও দিল্লির বিরুদ্ধে ‘জিগির’ তোলাকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
ইশতেহারে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার বা কর্মসংস্থানের যে ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে, তার চেয়েও অনেক বেশি বড় হয়ে উঠেছে মুখ্যমন্ত্রীর ‘হতাশাজনক’ আক্রমণ। আইনি মারপ্যাঁচ এড়াতে তিনি ‘ফোন কল’ বা ‘হুমকি’র কথা বললেও, দিনের শেষে বাংলার সচেতন ভোটাররা বুঝছেন-রাজনৈতিক লড়াইয়ে তৃণমূল আজ কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রশ্ন একটাই, আজকের এই হাইভোল্টেজ ভাষণ কি ভোটারদের মন জয় করবে, না কি এটি পরাজয়ের আগে স্রেফ একটি আগাম ‘ডিফেন্সিভ’ কৌশল হিসেবেই ইতিহাসে থেকে যাবে?
