প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
পশ্চিমবঙ্গে আইনের শাসন কি এখন কেবলই প্রহসন? যে রাজ্যে খোদ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা সুরক্ষিত নন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলাও এখন অবান্তর। মালদহের কালিয়াচকে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে যে বেনজির তাণ্ডব দেখা গেল, তা কেবল বিক্ষোভ নয়—তা ছিল সরাসরি বিচারব্যবস্থার ওপর এক নগ্ন আঘাত। বুধবার বিকেল থেকে দীর্ঘ ১০ ঘণ্টা কালিয়াচক-২ নম্বর বিডিও অফিসে ৩ জন মহিলা বিচারকসহ ৭ জন জুডিশিয়াল অফিসারকে যেভাবে ‘বন্দি’ করে রাখা হলো, তা পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক দেউলিয়াপনার এক চরম বহিঃপ্রকাশ।
ভোটার তালিকায় ‘বেনজির কারচুপি’র অভিযোগ তুলে এদিন বিডিও অফিস ঘিরে ফেলে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ রূপ নেয় যে, বিক্ষোভকারীদের রক্তচক্ষুর সামনে স্থানীয় পুলিশ কার্যত ঠুটো জগন্নাথ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ১২ নম্বর জাতীয় সড়ক দীর্ঘ সময় অবরোধ করে রাখা হলেও প্রশাসন ছিল নির্বিকার। অভিযোগ উঠেছে, একটি বিশেষ ভোট ব্যাংকের রোষানলে পড়ার ভয়েই পুলিশ প্রথম দিকে কড়া পদক্ষেপ নিতে সাহস পায়নি। ফলে ৩ জন মহিলা বিচারককে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই অফিসের ভেতরে কাটাতে হয়। যা কি না একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের পক্ষে চরম লজ্জার বিষয়!
বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা যখন সরকারি কাজে গিয়ে আক্রমণের শিকার হন বা অবরুদ্ধ থাকেন, তখন বুঝতে হবে রাজ্যে অরাজকতা চরম সীমায় পৌঁছেছে। কেন বিডিও অফিসে পর্যাপ্ত পুলিশি নিরাপত্তা ছিল না? কেন কয়েক হাজার উন্মত্ত জনতা অনায়াসেই একটি সরকারি দফতর ও বিচারকদের আটকে রাখার দুঃসাহস পেল? বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, রাজ্যে ‘তোষণ রাজনীতির’ প্রশ্রয়ে দুষ্কৃতীরা এখন এতটাই বেপরোয়া যে তারা খোদ আদালতকেও তোয়াক্কা করছে না। কেন্দ্রীয় বাহিনীর হস্তক্ষেপে মধ্যরাতে যখন রুদ্ধশ্বাস অভিযানে বিচারকদের উদ্ধার করা হয়, তখন বোঝা যায় রাজ্যের পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষ তো বটেই, এমনকি বিচারকদেরও আর বিন্দুমাত্র ভরসা নেই। বিজেপির অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বেছে বেছে প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকদের নাম তালিকা থেকে ছেঁটে ফেলা হচ্ছে, অথচ অনুপ্রবেশ কারীদের নাম বহাল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে এক শ্রেণির আমলা ও শাসকদলের একাংশ। কালিয়াচকের এই বিক্ষোভ আসলে সেই কারচুপির দিকেই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিচারকদের আটকে রাখা আসলে বিচারব্যবস্থাকে ভয় দেখানোর একটি পরিকল্পিত কৌশল মাত্র। যদি বিচারব্যবস্থাকে এভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়, তবে আগামী নির্বাচনে অবাধ লুণ্ঠন ও ছাপ্পা চালানো অনেক সহজ হবে। জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়ার এই খেলায় প্রশাসন কেন নীরব দর্শক, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ইতিমদ্ধেই এই ঘটনায় কড়া রিপোর্ট তলব করেছে এবং ডিজি-র কাছে জবাব চেয়েছে। কিন্তু মূল প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—রাজ্যের এই ‘মগের মুলুক’ পরিস্থিতি কি আদৌ বদলাবে? কালিয়াচকের এই রুদ্ধশ্বাস রাত রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতার যে কলঙ্ক লেপে দিল, তা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। আজ বিচারকরা বন্দি, কাল কে? গণতন্ত্রের এই অন্ধকার অধ্যায় রাজ্যবাসীর মনে গভীর শঙ্কার সৃষ্টি করেছে। যদি বিচারব্যবস্থাই আক্রান্ত হয়, তবে সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়টুকুও কি ধুলিসাৎ হতে চলেছে?
