প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-শহর কলকাতা রূপান্তর ভালোবাসে। তাই ভাঙা জীর্ণ খোলস ছেড়ে এখানে রোজ মাথা তোলে নতুন নতুন আকাশছোঁয়া বহুতল, আধুনিক বাণিজ্যিক গুদাম। কিন্তু সেই রূপান্তরের ভেতরের কঙ্কালটা যে কতটা নির্মম আর নড়বড়ে, তার প্রমাণ দিতে আরও পাঁচটা তাজা প্রাণকে চলে যেতে হলো মাটির নিচে। গত বুধবার ভরদুপুরে তারাতলার ব্রেসব্রিজে নির্মাণাধীন গুদামের ছাদ ধসে পড়ার ঘটনা কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি আসলে মহানগরের বুকে আরও একবার মানবিকতার অপমৃত্যু।
দুর্ঘটনার পর কেটে গেছে বেশ কিছু ঘণ্টা। ধুলোমাখা ধ্বংসস্তূপের ওপর এখন হয়তো শুধুই পড়ে রয়েছে কয়েকটা ভাঙা প্লাস্টিকের হেলমেট, চটি আর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা দুপুরের না-খাওয়া টিফিন বাক্স। যে মানুষগুলো সকালের চড়া রোদে একটু ভালো থাকার আশায়, নিজেদের গ্রামের বাড়িতে দুটো বাড়তি টাকা পাঠানোর স্বপ্নে ঘাম ঝরাচ্ছিলেন, দুপুরের এক নিমেষের কর্কশ শব্দে তাঁদের সমস্ত স্বপ্ন মাটির সাথে মিশে গেল। এসএসকেএম হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ইউনিটের বাইরে স্বজনহারাদের যে বুকফাটা কান্না, তার ভাষা হয়তো আমাদের চেনা কাঠামোগত অডিটের খতিয়ানে ধরা পড়ে না।
এই দৃশ্য কলকাতার মানুষের বড্ড চেনা, বড্ড চেনা এই হাহাকার। তারাতলার এই হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়া লোহার বিম আর কংক্রিটের চাঁই নিমেষের মধ্যে উস্কে দিল ২০১৬ সালের পোস্তা উড়ালপুল ভাঙার সেই বিভীষিকা, কিংবা অতি সাম্প্রতিক গার্ডেনরিচের সেই অভিশপ্ত রাতের স্মৃতি। সময় পাল্টেছে, ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে ২০২৬ হয়েছে, কিন্তু বদলায়নি সস্তা উপকরণের লোভ আর শ্রমিকের সস্তা জীবনের সমীকরণ। সেবারও ধুলোর ঝড় উঠেছিল, এবারও উঠল। সেবারও স্বজনহারাদের কান্নায় ভারী হয়েছিল কলকাতার বাতাস, এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রকৃতির কোনো আকস্মিক দুর্যোগ এই প্রাণগুলো কেড়ে নেয়নি। খোদ প্রত্যক্ষদর্শীরাই জানিয়েছেন, সকাল থেকেই নাকি ইস্পাতের পরিকাঠামোটি যন্ত্রণায় কাঁপছিল। অবলা লোহার সেই কাঁপুনি আসলে ছিল এক নীরব সতর্কবার্তা। কিন্তু লোভের তাড়নায় অন্ধ ঠিকাদার আর আধিকারিকরা সেই সতর্কবার্তাকে পাত্তা দেননি। শ্রমিকের জীবনের চেয়ে তাঁদের কাছে হয়তো জরুরি ছিল ঢালাইয়ের কাজ শেষ করার তাড়া।
আজ প্রশাসন তৎপর, সিট (SIT) গঠিত হয়েছে, শুরু হয়েছে রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি আর ক্ষতিপূরণের হিসেব-নিকেশ। কিন্তু যে মা তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন, কিংবা যে শিশুটি আর কোনোদিন তাঁর বাবার কোলে উঠতে পারবে না, তাদের এই অপূরণীয় ক্ষতি কি কোনো তদন্ত বা অনুদান মেটাতে পারবে? তারাতলার এই ট্র্যাজেডি আজ কলকাতার বিবেকের সামনে এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়ে দিল— আমরা কি সত্যিই এক আধুনিক নিরাপদ শহরের বাসিন্দা, নাকি কোনো এক অদৃশ্য নরককুণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে রোজ মৃত্যুর জুয়া খেলছি?
