প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও কিছু অভ্যাস যে সহজে বদলায় না, তার প্রমাণ মিলল আজ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার অন্দরে। সদ্য সমাপ্ত ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাজ্যে প্রথমবার সরকার গঠন করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP)। অন্যদিকে, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনকাল হারিয়ে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে হয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসকে। কিন্তু আজ বিধানসভায় শপথ গ্রহণের দিনেই বিরোধী শিবিরের সেই পুরনো গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব ও পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আবারও একেবারে হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিল।
আজ বিধানসভায় নবনির্বাচিত বিধায়কদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান ছিল। বেলেঘাটা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলের টিকিটে জয়ী কুণাল ঘোষকে আজ বিধায়ক পদের শপথবাক্য পাঠ করান বিধানসভার বর্তমান প্রোটেম স্পিকার তথা বিজেপি বিধায়ক তাপস রায়। একসময়ের সতীর্থ, আজ রাজনৈতিক শিবিরের সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই মেরুতে দাঁড়িয়ে। কিন্তু নিয়তির চাকা এমনভাবে ঘুরল যে, তৃণমূলের বিজয়ী বিধায়ককে আজ মাথা নিচু করে শপথ নিতে হলো শাসক দল বিজেপির হেভিওয়েট নেতার সামনে।এই ঘটনার ঠিক পরেই কুণাল ঘোষ তাঁর ফেসবুক দেওয়ালে একটি দীর্ঘ এবং অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ পোস্ট করেন। কোনো রাখঢাক না রেখেই তিনি বিষয়টিকে ‘ভাগ্যচক্র’ বলে অভিহিত করেন।
তাপস রায়কে নিজের ‘দীর্ঘদিনের দাদা এবং নেতা’ সম্বোধন করে কুণাল স্পষ্ট লেখেন, “তাপসদাকে তৃণমূলে রাখতে আমরা চেষ্টা করেছিলাম। পারিনি, দুর্ভাগ্য।”এখানেই শেষ নয়, তৃণমূলের অন্দরের ক্ষোভ উগরে দিয়ে কুণাল দাবি করেন, উত্তর ও মধ্য কলকাতায় তাপস রায় এবং সজল ঘোষের মতো জনভিত্তিসম্পন্ন নেতাদের একসময় দল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। অতীতে তাপস রায়ের প্রশংসা করার জন্য কুণালকে যেভাবে দলের কোপের মুখে পড়তে হয়েছিল, সেই কথাও তিনি মনে করিয়ে দেন।
কুণাল ঘোষের এই বিস্ফোরক পোস্টের পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে জল্পনা তুঙ্গে। প্রশ্ন উঠছে, কুণাল ঘোষের এই ক্ষোভের আসল নিশানা কে বা কারা? পোস্টে তিনি সরাসরি লিখেছেন, যাঁদের কারণে তাপস রায় বা সজল ঘোষদের মতো নেতারা দল ছাড়তে বাধ্য হলেন, তাঁরা আজ ক্ষমতা হারানোর পরেও ‘কাঁদুনি পলিটিক্স’ করছেন এবং নিজেদের আখের গোছাতে ‘স্বজনপোষণ’ চালাচ্ছেন।
রাজনৈতিক মহলের স্পষ্ট ধারণা, নাম না করলেও কুণালের এই আক্রমণের তির উত্তর কলকাতার তৃণমূলের সেই প্রভাবশালী বিরোধী গোষ্ঠীর দিকে, যাঁদের একনায়কতন্ত্রের কারণেই দল আজ বিরোধী আসনে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কুণাল ঘোষ যা লিখেছেন, তা আসলে পরম সত্য এবং তৃণমূলের বর্তমান শোচনীয় পরিস্থিতির আসল কারণ। তাপস রায়ের মতো স্বচ্ছ ভাবমূর্তির প্রবীণ নেতাকে যেভাবে তৃণমূলের ভেতরে কোণঠাসা হতে হয়েছিল এবং সম্মান বাঁচাতে তিনি যেভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন, আজ তৃণমূলেরই একজন বিজয়ী বিধায়ক তা প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিলেন।
বিজেপির ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, তৃণমূল যে স্বজনপোষণ এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ধ্বংস হয়েছে এবং ক্ষমতা হারানোর পরেও তারা যে কোনো শিক্ষা নেয়নি, কুণাল ঘোষের পোস্ট তারই অকাট্য আইনি ও রাজনৈতিক প্রমাণ। কুণাল ঘোষ তাঁর পোস্টের শেষে বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে তীব্র আত্মবিশ্লেষণ বা ‘ইন্ট্রোস্পেকশন’ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পরাজয়ের পরেও কি তৃণমূল নেতৃত্ব এই অন্তর্কলহ থেকে শিক্ষা নেবে? বিধানসভায় বিজেপির হাত ধরে তৃণমূল বিধায়কের শপথ এবং তারপরেই কুণাল ঘোষের এই ‘টাইম বোম’ পোস্ট— সব মিলিয়ে বিরোধী শিবিরের অন্দরের ফাটলটা আরও একবার প্রকাশ্য রাস্তায় চলে এল।
