প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে চিরশত্রু বা চিরমিত্র বলে সত্যিই কিছু হয় না— এই পুরনো আপ্তবাক্যটি আজ আরও একবার প্রমানিত হলো। মে মাসের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় তো ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যে এখন বিজেপির সরকার। আর ক্ষমতা হারানোর পর বিরোধী আসনে বসা ঘাসফুল শিবিরের অন্দরে আজ এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের সাক্ষী থাকল ধর্মতলার ‘ওয়াই চ্যানেল’। মঙ্গলবার, তৃণমূলের পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি চলাকালীন মঞ্চেই আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েন বেলেঘাটার বিধায়ক তথা দলের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। আর ঠিক সেই সময়ই এক অদ্ভুত ‘স্নেহের’ নিদর্শন তুলে ধরলেন স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রাজনীতির চাকা ঘুরে গিয়েছে। নবান্ন বা ক্ষমতার অলিন্দ থেকে বহু দূরে, ধর্মতলার রাজপথেই এখন ঠাঁই হয়েছে বিরোধী শিবিরের। তীব্র গরম এবং আর্দ্রতার জেরে আজ মঞ্চের মধ্যেই তীব্র অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করেন কুণাল ঘোষ। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, শারীরিক অসুস্থতার জেরে আচমকা তিনি নেতিয়ে পড়েন। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই লাইমলাইটে চলে আসেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সমস্ত গাম্ভীর্য সরিয়ে রেখে তিনি নিজেই ছুটে যান কুণালবাবুর কাছে। মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে হাতপাখা দিয়ে হাওয়া করা— একবারে ঘরের অভিভাবকের ভূমিকায় দেখা গেল তাঁকে।
এবার একটু ভেতরের সমীকরণটা খতিয়ে দেখা যাক। ওপর ওপর দেখলে একে শুধুই মানবিকতা মনে হতে পারে, কিন্তু রাজনীতির অলিন্দে প্রশ্ন জাগতেই পারে— এই ‘স্নেহস্পর্শ’ কি শুধুই সৌজন্য? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিরোধী শিবিরের টিকে থাকার অন্য কোনো বড় বাধ্যবাধকতা? মনে করে দেখুন, ক্ষমতা হারানোর আগে ও পরে, কুণাল ঘোষের মুখে বারবার শোনা গিয়েছে দলের একাংশের বিরুদ্ধে ক্ষোভের সুর। কখনো ‘নবীন-প্রবীণ’ দ্বন্দ্ব নিয়ে সরব হয়েছেন, কখনো তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ঘিরে তৈরি হয়েছে তীব্র জল্পনা। আজ ক্ষমতা হারিয়ে যখন দল এমনিতেই ব্যাকফুটে, তখন কুণাল ঘোষের মতো একজন ‘ঠোঁটকাটা’ নেতাকে যদি কোনোভাবে ধরে রাখা না যায়, তবে দলের অন্দরের ফাটল যে আরও চওড়া হবে, তা কি ভালোই বুঝতে পারছেন দলনেত্রী? এই অতি-সক্রিয়তা কি আসলে বিরোধী শিবিরের অন্দরে বড়সড় ভাঙন রোখার এক মরিয়া চেষ্টা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই ছবি বাংলার নতুন রাজনৈতিক আবহে এক বড় আলোচনার জন্ম দিল। কুণাল ঘোষ, যিনি মাঝেমধ্যেই দলকে অস্বস্তিতে ফেলতে দ্বিধা করেন না, তাঁর প্রতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই প্রকাশ্য স্নেহ প্রদর্শন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শাসক দল বিজেপির অন্দরমহল থেকেও এই ঘটনাকে বেশ কৌতূহলের সঙ্গেই দেখা হচ্ছে। বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মতে, ক্ষমতা হারিয়ে তৃণমূল এখন এতটাই দিশেহারা যে সামান্যতম অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ সামাল দিতেও খোদ দলনেত্রীকে ময়দানে নামতে হচ্ছে।
আপাতত জানা গিয়েছে, ঘটনাস্থলেই প্রাথমিক চিকিৎসার পর কুণালবাবু কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। অতিরিক্ত গরম, ডিহাইড্রেশনের কারণেই এই বিপত্তি বলে চিকিৎসকদের প্রাথমিক অনুমান। তবে শারীরিক অসুস্থতা যাই হোক না কেন, নতুন সরকারের জমানায় ধর্মতলার বিরোধী মঞ্চ থেকে আজ যে রাজনৈতিক বার্তার পারদ চড়ল, আগামী দিনে তা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন দেখার।
