প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বসন্তের তপ্ত রোদে নন্দীগ্রামের মাটি এমনিতেই গরম, কিন্তু সোমবার সকালে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী যা ‘রাজনৈতিক বারুদ’ ঢাললেন, তাতে গোটা বাংলার নজর এখন এই হাইভোল্টেজ কেন্দ্রে। রেয়াপাড়ার শিব মন্দিরে মহাদেবের চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে, হলদিয়ায় মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ঠিক আগে শুভেন্দু যে ভঙ্গিতে তৃণমূলকে আক্রমণ করলেন, তাকে এক কথায় ‘অল-আউট অ্যাটাক’ বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শুভেন্দু অধিকারীর এদিনের বক্তব্যের সবচেয়ে চর্চিত অংশ ছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক আচরণের তুলনা। তিনি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলেন, “অদ্ভূত এক সমাপতন! যেদিন আমি ভক্তিভরে কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে যাই, ঠিক সেই বিশেষ দিনটিতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামাজ পড়তে ছোটেন।” শুভেন্দুর এই এক লাইনের খোঁচা সোশ্যাল মিডিয়ায় আগুনের মত ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক মহলের রসিকতা, একেই বলে ‘একজন যদি ডানে যায়, অন্যজন তবে ঠিক বাঁয়ে!’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে শুভেন্দু খুব সুকৌশলে ভোটারদের মনে করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, বাংলার রাজনীতিতে এখন ‘পুজো বনাম তোষণ’-এর এক অদৃশ্য লড়াই চলছে।
এদিন শুভেন্দুর মেজাজ ছিল যেন পিচে নামা কোনো অভিজ্ঞ হার্ড-হিটার ব্যাটসম্যানের মতো। তিনি মনে করিয়ে দেন, পশ্চিমবঙ্গ কোনো সাধারণ ভূখণ্ড নয়; এটি শ্রীচৈতন্যদেব, ঠাকুর রামকৃষ্ণ এবং জগৎজননী মা সারদার পুণ্যভূমি। যারা রাম মন্দিরের বিরোধিতা করে রাজপথে মিছিল বের করে, কিংবা মহাকুম্ভের মতো পবিত্র জমায়েতকে ‘মৃত্যু কুম্ভ’ বলে ব্যঙ্গ করে, তাদের এই মাটিতে কোনো স্থান নেই। শুভেন্দুর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “যারা সনাতন ধর্মকে ‘গন্ধা’ (নোংরা) বলে গালি দেয়, তাদের এবার পাততাড়ি গুটিয়ে নিতে হবে। সনাতনীদের অবমাননা করে কেউ এই ভূমি থেকে জিতে ফিরতে পারবে না।”
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রাম দেখেছিল এক ঐতিহাসিক লড়াই, যেখানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে শুভেন্দু হয়ে উঠেছিলেন ‘জায়ান্ট কিলার’। আজ ফের সেই স্মৃতি উসকে দিয়ে তিনি বলেন, “আমি যদি রাষ্ট্র এবং সনাতন ধর্মের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিরলস কাজ করি, তবে ২০২১-এর মতই নন্দীগ্রামের মানুষ এবারও আমাকে দু-হাত ভরে আশীর্বাদ করবেন।” শুভেন্দুর এই আত্মবিশ্বাসী সুর তৃণমূলের ভোট ম্যানেজারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। কারণ, নন্দীগ্রামের ভোট মানেই কেবল পাটিগণিত নয়, এখানে ধর্মীয় ও আঞ্চলিক আবেগ বরাবরই নির্ণায়ক ভূমিকা নেয়।
এদিন হলদিয়ার পথে শুভেন্দুর মিছিলে গেরুয়া আবিরের দাপট আর ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে কান পাতা দায় ছিল। একদিকে শিব মন্দিরে রুদ্রাভিষেক, অন্যদিকে মনোনয়নের আগে এই ঝাঁঝালো ভাষণ— সব মিলিয়ে শুভেন্দু আজ একাই মঞ্চ কাঁপালেন। তৃণমূল অবশ্য একে ‘সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ’ বলে পাল্টা তোপ দাগছে। তাদের দাবি, উন্নয়নই হবে শেষ কথা। কিন্তু শুভেন্দুর বাউন্সারে তারা যে কিছুটা হলেও রক্ষনাত্মক খেলছে, তা তাদের প্রতিক্রিয়াতেই স্পষ্ট।
নন্দীগ্রামের অলিগলি এখন একটা বড় প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে— এবারও কি শুভেন্দুর ‘সনাতনী ঝোড়ো ব্যাটিং’ কাজ করবে? নাকি তৃণমূলের ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ আর উন্নয়নের তাস সব হিসেব বদলে দেবে? দিনের শেষে শুভেন্দুর বার্তা একটাই— “সনাতন বিরোধীদের পরাজয় নিশ্চিত।” এখন দেখার, আসন্ন নির্বাচনে নন্দীগ্রামের ইভিএম বক্সে কোন পক্ষের ‘মন্ত্র’ বেশি সফল হয়। লড়াইটা এখন আর কেবল রাজনৈতিক নেই, তা হয়ে দাঁড়িয়েছে আদর্শ এবং অস্তিত্বের।
