প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট–
পশ্চিমবঙ্গের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি তবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে? খোদ বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা যেখানে সুরক্ষিত নন, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? মালদার মোথাবাড়িতে বিশেষ ভোটার তালিকা সংশোধনের (SIR) কাজে নিযুক্ত সাতজন বিচারককে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘বন্দী’ করে রাখার ঘটনায় এই প্রশ্নই তুলল দেশের সর্বোচ্চ আদালত। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনায় রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষ স্তরে কার্যত কম্পন সৃষ্টি করে দিয়ে মুখ্যসচিব, পুলিশ মহানির্দেশক (DGP), মালদার জেলাশাসক (DM) এবং পুলিশ সুপারকে (SP) সশরীরে হাজিরার কড়া নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
বুধবার মালদার কালিয়াচক ২ নম্বর ব্লকের মোথাবাড়িতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। সেখানে কর্মরত বিচারকদের ঘেরাও করে রাখা হয় বলে অভিযোগ। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে এই মামলার শুনানি চলাকালীন যে তথ্য সামনে আসে, তা শিউরে ওঠার মত। আদালত জানতে পারে, তিন মহিলা অফিসারসহ মোট সাতজন বিচারককে প্রায় ৯ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়েছিল। এমনকি তাঁদের সঙ্গে থাকা ৫ বছরের এক শিশুকেও রেহাই দেয়নি উন্মত্ত জনতা। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে মন্তব্য করেন, “গতকাল বিকেল ৫টা থেকে অফিসারদের আটকে রাখা হল! তাঁদের জল-খাবার পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। ৫ বছরের একটি শিশু কাঁদছে, অথচ প্রশাসনের কোনও হেলদোল নেই!” তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, জুডিশিয়াল অফিসারদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব এবং এই ঘটনায় প্রশাসনের ‘চরম ব্যর্থতা’ প্রকট হয়েছে।
শুনানি চলাকালীন রাজ্য সরকারের অ্যাডভোকেট জেনারেলকে কার্যত তুলোধনা করেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত। তিনি মন্তব্য করেন, “সব থেকে দুর্ভাগ্যজনক হল আপনার রাজ্যে সব কিছু নিয়ে রাজনীতি হয়। আদালতের নির্দেশ মানার ক্ষেত্রেও রাজনীতি? আপনারা কি ভাবেন আমরা জানি না এই ঘটনার নেপথ্যে কারা রয়েছে?” আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বিচারবিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এক পরিকল্পিত চক্রান্ত।
এই ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে (Suo Motu) পদক্ষেপ নিয়েছে। আদালতের নির্দেশগুলি হলো: রাজ্যের মুখ্যসচিব, DGP, মালদার DM এবং SP-কে শোকজ নোটিস দেওয়া হয়েছে। তাঁদের ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন এই অরাজকতা রুখতে তাঁরা ব্যর্থ হলেন। আগামী ৬ এপ্রিল ভার্চুয়াল মাধ্যমে এই চার শীর্ষ আধিকারিককে আদালতের সামনে উপস্থিত থাকতে হবে। বিচারকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে কেন্দ্রীয় বাহিনী (Central Forces) মোতায়েনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালত এই ঘটনার তদন্তে CBI বা NIA-এর মত কেন্দ্রীয় সংস্থাকে যুক্ত করার ইঙ্গিত দিয়েছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বিধাষসভা ভোটের মুখে মালদার এই ঘটনা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যেখানে খোদ বিচারকরাই ‘গণতন্ত্রের উৎসবে’ কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন, সেখানে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিয়ে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন ঝুলে রইল। এখন দেখার, ৬ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের কড়া প্রশ্নের মুখে রাজ্যের শীর্ষ আমলারা কী সাফাই পেশ করেন।
