প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-নবান্ন হাতছাড়া হওয়ার পর এবার কি তবে হরিশ চ্যাটার্জি স্ট্রিটের সেই হাইপ্রোফাইল বাড়ির অন্দরেও নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে? ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরেই কি এবার দলের অন্দরেই শুরু হয়ে গেল তীব্র মতবিরোধ? রাজনৈতিক মহলে এখন এই প্রশ্নই সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে। কারণ, আজকে কোনো বিরোধী দল নয়, খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের ভাই স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায় ওরফে বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায় এক নজিরবিহীন ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নিজের দলের বিরুদ্ধে। দিদির সাধের দলের বিরুদ্ধে খোদ ভাইয়ের এই প্রকাশ্য অসন্তোষকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।যাঁরা এতদিন তৃণমূলের অন্দরে অল-ইজ-ওয়েল বলে ভাবতেন, ক্ষমতা হারিয়ে বিরোধী আসনে বসতেই আজ তাঁদের সামনে বাস্তব পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে শুরু করেছে।
আজকে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলে বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় ঝরে পড়েছে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা বঞ্চনার তীব্র ক্ষোভ। তিনি সটান অভিযোগ তুলে বলেছেন, “২০১৩ সাল থেকেই আমি দলের ভেতরে কোণঠাসা!” ভাবুন একবার! যাঁর দিদি এতদিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন, যাঁর পরিবারকে ঘিরে দলের সমস্ত সিদ্ধান্ত আবর্তিত হতো, সেই ভাই নাকি এক যুগ ধরে দলের ভেতরেই তীব্র রাজনৈতিক উপোসের শিকার। আর এই ক্ষোভের তীর কার দিকে? দলের অন্দরের সেইসব হেভিওয়েট নেতাদের দিকে, ক্ষমতা হারিয়েও যাঁদের রাজনৈতিক দাপট কমেনি। অরূপ বিশ্বাসের মতো প্রাক্তন মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাই। যে দল এতদিন ক্ষমতার জোরে বিরোধী শিবিরকে কোণঠাসা করার রাজনীতি করত, আজ ক্ষমতা যেতেই তাদের নিজেদের অন্দরের ফাটল হুড়মুড়িয়ে সামনে আসতে শুরু করেছে।
তবে এই ঘটনার আসল রাজনৈতিক ক্লাইম্যাক্স লুকিয়ে আছে বাবুনের পরবর্তী ইচ্ছার মধ্যে। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তিনি এখন কাজ করতে চান বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব তথা শুভেন্দু অধিকারী এবং নিশীথ প্রামাণিকের সঙ্গে!হ্যাঁ, ঠিকই শুনছেন। অরূপ বিশ্বাসদের আচরণে যিনি ক্ষুব্ধ, সেই বাবুনের মুখে আজ নিশীথ প্রামাণিকের প্রশংসা! রাজনীতিতে এই সমীকরণ বদলানো নতুন কিছু নয়। কিন্তু যখন এই ভাঙন খোদ বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের দোরগোড়ায় এসে ধাক্কা মারে, তখন বুঝতে হবে দলের অন্দরের সাংগঠনিক রাশ পুরোপুরি আলগা হয়ে গেছে। ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ছিটকে যাওয়ার পরেই কি তবে এতদিনের রাজনৈতিক ঐক্যের মেকি মুখোশটা খসে পড়ল? স্বার্থের রাজনীতি যখন দরজায় কড়া নাড়ে, তখন ‘ঐক্যের’ বুলিটা যে কতটা ঠুনকো, তা আজ বাংলার মানুষের সামনে আরও একবার প্রমাণিত হলো।
ইতিপূর্বেও যখন বাবুন সামান্য একটু বেসুরো গেয়েছিলেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে নাটকীয়ভাবে বলেছিলেন, “আমি ওর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।” কিন্তু রক্তের টান কি রাজনৈতিক বিরোধের চেয়েও সস্তা হয়ে গেল কালীঘাটে? সম্পর্ক ছিন্ন করা কি এতই সহজ? জাতীয়তাবাদী শিবির বরাবরই ব’লে এসেছে, তৃণমূল কোনো আদর্শগত রাজনৈতিক দল নয়, ওটা আসলে একদল সুবিধাভোগী মানুষের মঞ্চ। আজ ক্ষমতা চলে যেতেই সেই নেতাদের মধ্যেই পদের ভাগ ও কর্তৃত্ব নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হয়ে গেছে। ভাই বলছেন তিনি বঞ্চিত, আর দল বলছে অন্য কথা—জনগণকে বোকা বানানোর এই রাজনৈতিক খেলা আর কতদিন চলবে?
বাবুনের আজকের এই ক্ষোভ স্পষ্ট করে দিল—তৃণমূলের সাংগঠনিক শক্তি এবার চূড়ান্ত বিপর্যয়ের রূপ নিচ্ছে। ভেতরের অসন্তোষ যখন প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসে, তখন কোনো ড্যামেজ কন্ট্রোলেই আর কাজ হয় না। শুভেন্দু অধিকারীর হাত ধরে বাবুন বন্দ্যোপাধ্যায় পদ্মশিবিরে নাম লেখাবেন কি না, তা হয়তো সময়ই বলবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার—কালীঘাটের দেওয়ালে এবার বড়সড় ফাটল ধরেছে।
