প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরে দীর্ঘদিনের কোন্দল ও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জেরে এক নজিরবিহীন ও ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিল ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। গত ১৭ সেপ্টেম্বর এক অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশিকা জারি করে কমিশন তৃণমূলের মূল নাম এবং দীর্ঘ ২৮ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘ঘাসের ওপর জোড়াফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করেছে। আগামী ৬ অক্টোবরের নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের হাইভোল্টেজ উপনির্বাচনের ঠিক আগেই এই সিদ্ধান্ত রাজ্য রাজনীতিতে এক চরম ভূকম্পন সৃষ্টি করেছে। দল ও প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার পর ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে এক আবেগঘন ও রুদ্ধশ্বাস সাংবাদিক বৈঠক করেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে নিজের তৈরি দলের প্রতীক হারানোর যন্ত্রণাকে সরাসরি মা ও সন্তানের গভীর সম্পর্কের সাথে তুলনা করে ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনি।উদ্বেলিত কণ্ঠে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “যদি কেউ সত্যিই তৃণমূলকে ভালোবাসত, তবে তারা তৃণমূলের মা-কে কেড়ে নিত না, তৃণমূলকে এভাবে মাতৃহারা করত না। একটা মা-ই বোঝে সন্তান হারানোর কষ্ট ঠিক কতটা, আর সন্তান বোঝে মা-কে হারানোর যন্ত্রণা। যারা বছরের পর বছর লড়াই, আন্দোলন আর নিজেদের রক্ত দিয়ে এই সংগঠন গড়ে তোলেনি, তারা এই মানসিক ও আত্মিক টান কোনোদিনও বুঝতে পারবে না।” নিজের হাতে তৈরি প্রতীক ছিনিয়ে নেওয়ার এই দিনটিকে দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের একটি ‘কালো দিন’ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী উপনির্বাচনে দলটির অভ্যন্তরীণ দুটি গোষ্ঠীই মূল নাম ও প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য নতুন নাম অনুমোদিত হয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ (MAITC) এবং তাদের নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে ‘ফুটবল প্লেয়ার’। অন্যদিকে, বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরূপ রায়ের গোষ্ঠীকে ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম দিয়ে ‘খাম’ প্রতীক বরাদ্দ করেছে কমিশন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের এই একতরফা সিদ্ধান্ত তিনি কোনোভাবেই মেনে নিচ্ছেন না। দলের আদি পরিচয় ও প্রতীক ফিরে পেতে ইতিমধ্যেই তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালত তথা সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁর শিবিরের দাবি, কমিশনের এই সিদ্ধান্ত আইনিভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং সুপ্রিম কোর্ট থেকে তাঁরা তাঁদের আসল প্রতীক ফেরত পাবেনই। এই কঠিন সংকটের মুহূর্তে জাতীয় স্তরে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী তাঁর পাশে থাকার পূর্ণ আশ্বাস দিয়েছেন বলে তিনি জানান।
এদিকে রাজ্যে সদ্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই ঘটনাকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, এটি সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের একটি আইনি বিষয়, এর সাথে ভারতীয় জনতা পার্টির কোনো সম্পর্ক নেই। তবে যারা একসময় ক্ষমতার অহংকারে অন্ধ হয়ে নিজেদের ধরাকে সরা জ্ঞান করত, আজ তাদের এই পরিণতি আদতে ঈশ্বরেরই এক চরম বিচার। ২৮ বছরের পুরনো রাজনৈতিক প্রতীকের এই আকস্মিক অন্তর্ধান এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার আইনি লড়াই আগামী দিনে বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণকে কোন দিকে ঘুরিয়ে দেয়, এখন সেটাই দেখার।
