প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এত বড় অগ্নিপরীক্ষা এর আগে কখনো দিতে হয়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুতি, অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক মূল ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক সাময়িকভাবে ফ্রিজ করে দেওয়ার ধাক্কায় আক্ষরিক অর্থেই কোণঠাসা নেত্রী। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে উপনির্বাচনের জন্য তাঁর শিবিরের নতুন নাম হয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং প্রতীক ‘ফুটবলার’। কিন্তু এই ঘোর রাজনৈতিক অমানিশায় যখন দলের বহু চেনা মুখ দিকবদল করছেন, তখন নেত্রীর পাশে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কুণাল ঘোষ, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা মহুয়া মৈত্রের মতো কট্টরপন্থীরা। এই চরম দুর্দিনে যাঁরা নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বাজি রেখে মমতাকেন্দ্রীক লড়াইতে টিকে আছেন, সুদিন ফিরলে মমতা তাঁদের মনে রাখবেন তো? নাকি ক্ষমতার সুদিন ফিরলে এরা আবার দল বা নেত্রীর থেকে দূরে চলে যাবেন কিংবা ব্রাত্য হবেন? রাজনৈতিক মহলে এখন এটাই সবচেয়ে বড় লাখ টাকার প্রশ্ন।
দল যখন কার্যত আড়াআড়ি বিভক্ত, তখন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আইনি লড়াইয়ের প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। অন্যদিকে, কুণাল ঘোষ কিংবা মহুয়া মৈত্ররা সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে রাজপথ—সব জায়গায় মমতার নতুন নাম ও নতুন প্রতীকের হয়ে প্রচারের সলতে পাকাচ্ছেন।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তৃণমূলের বর্তমান যা পরিস্থিতি, তাতে এই নেতারা অনায়াসেই নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করতে পারতেন। কিন্তু তা না করে তাঁরা নিজেদের ক্যারিয়ার মমতাকেন্দ্রীক রাজনীতির সাথে বেঁধে ফেলেছেন। এটা যেমন তাঁদের আনুগত্যের প্রমাণ, তেমনই একপ্রকার চরম রাজনৈতিক জুয়াও বটে।
ইতিহাস সাক্ষী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের উত্থান-পতনের গ্রাফ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে যখন তিনি দল গড়েন, তখন বহু নেতা তাঁর পাশে ছিলেন যাঁরা পরবর্তীতে ক্ষমতার অলিন্দে পিছনের সারিতে চলে গিয়েছেন, আবার গুরুত্ব বেড়েছে নতুন ও সুবিধাবাদী মুখের। ওয়াকিবহাল মহলের একাংশের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিরকালই আবেগের চেয়ে রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তাকে বেশি প্রাধান্য দিয়ে এসেছেন। সুদিন যখন ফেরে, তখন দল চালাতে প্রয়োজন হয় ভিন্ন সমীকরণের। ফলে আজকের এই দুর্দিনের কাণ্ডারীদের কপালে সুদিনে কতটা পুরস্কার জুটবে, নাকি তারা আবার দূরে সরে যাবেন, তা নিয়ে খোদ দলের অন্দরেই কানাঘুষো চলছে।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা এই বিশ্লেষণকে তিনটি অ্যাঙ্গেলে দেখছেন। যদি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই প্রবল ধাক্কা সামলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারেন, তবে কুণাল-কল্যাণ-মহুয়াদের অবদানকে অস্বীকার করা তাঁর পক্ষে কঠিন হবে। ক্ষমতা অলিন্দে সুদিন ফিরলে আজ যাঁরা অন্য শিবিরে আছেন, তাঁদের অনেকেই আবার মমতার ছাতার তলায় ফিরতে চাইবেন। তখন বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থে কিংবা ভোট ব্যাংকের সমীকরণে সেই ‘প্রত্যাগতদের’ বেশি গুরুত্ব দিতে গিয়ে এই পুরনো সেনাপতিরা বঞ্চিত হতে পারেন। তৃণমূল বা নতুন গড়ে ওঠা ‘মমতা তৃণমূল’ বরাবরই ব্যক্তিকেন্দ্রীক দল। অতীতে বহুবার দেখা গিয়েছে, দলের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড বা শীর্ষ তাত্ত্বিকদের ডানা ছাঁটতে নেত্রী বেশি সময় নেননি।
আপাতত নতুন প্রতীক ‘ফুটবলার’ হাতে নিয়ে আসন্ন উপনির্বাচনে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মরণপণ লড়াই লড়ছে মমতাপন্থী শিবির। তবে এই লড়াইয়ের ভবিষ্যৎ যাই হোক না কেন, বাংলার রাজনীতির অলিন্দে এই প্রশ্নটা কিন্তু ইতিমধ্যেই ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে—মমতার সুদিন ফিরলে কি সত্যিই ‘পুরস্কার’ পাবেন কুণাল-কল্যাণরা? নাকি ক্ষমতার নতুন আলোয় ঢাকা পড়ে যাবে দুর্দিনের এই বিশ্বস্ত সৈনিকদের আত্মত্যাগ? উত্তর দেবে শুধুই সময়।
