প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-নির্বাচন কমিশন (ECI) কর্তৃক তৃণমূলের ঐতিহ্যবাহী ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ফ্রিজ হওয়া এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য নতুন ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক বরাদ্দের পর বাংলার রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব ঝড় উঠেছে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বিস্ফোরক মন্তব্য এখন রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। প্রতীক ও নাম হারানোর পর ক্ষোভে ফেটে পড়ে দিদি বলেছেন—”ওরা তো আগেই বলেছিল, ‘নাম ভি রাখনে দুঙ্গা, নিশান ভি নেহি রাখনে দুঙ্গা’ (নামও রাখতে দেব না, নিশানও দেব না)!”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই হিন্দি উক্তি আসলে কোনো সাধারণ ক্ষোভ নয়, এর পেছনে রয়েছে রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর একটি পুরনো রাজনৈতিক হুঙ্কার এবং বর্তমানের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
মে মাসে বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভ করে বাংলায় বিজেপি সরকার গঠনের পর, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিরোধী শিবিরকে কোণঠাসা করতে গিয়ে ঠিক এই শব্দবন্ধটিই ব্যবহার করেছিলেন। আজ যখন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশে জোড়াফুল প্রতীকটি সাময়িকভাবে হাতছাড়া হলো, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শুভেন্দুর সেই পুরনো বয়ানকে হাতিয়ার করে আসরে নেমেছেন। এর মাধ্যমে তিনি আমজনতার কাছে প্রমাণ করতে চাইছেন যে, প্রতীক ফ্রিজ হওয়া কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি বর্তমান শাসকদলের একটি সুপরিকল্পিত “পলিটিক্যাল ভেনদেত্তা” (Political Vendetta) বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আক্রমণের পর চুপ থাকেননি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও। তিনি আজ সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে একটি সংস্কৃত প্রবাদ টেনে অত্যন্ত কড়া ভাষায় পাল্টা জবাব দিয়েছেন। শুভেন্দু বলেন, “অতি দর্পে হতা লঙ্কা, অতি মানে চ কৌরবাঃ… উনি ওনার নিজের দলকে একজোট রাখতে পারেননি, তার দায় বিজেপির নয়। নিয়ম মেনে সব পক্ষের কথা শুনেই নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।” শুভেন্দুর দাবি, দলের অন্দরে বিদ্রোহই তৃণমূলের এই অবস্থার জন্য দায়ী, এর পেছনে সরকারের কোনো হাত নেই। এই প্রতীক যুদ্ধের জল ইতিমধ্যেই গড়িয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত। নির্বাচন কমিশনের এই অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক আখ্যা দিয়ে ইতিমধ্যেই Supreme Court-এর দ্বারস্থ হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে সবচেয়ে বড় চমক তৈরি হয়েছে নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনে। মমতাপন্থী প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান আকস্মিক মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে সরাসরি কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করার নজিরবিহীন ঘোষণা করেছেন। আর এই ঘোষণার ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মিলন প্রধানকে একটি পুরনো মামলায় পুলিশ গ্রেফতার করায় রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন তুঙ্গে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “নামও রাখতে দেব না, নিশানও দেব না”—এই লাইনের মধ্য দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলার মানুষের মনে একটি নতুন সহানুভূতির হাওয়া (Sympathy Wave) তৈরি করতে চাইছেন। তিনি দেখাতে চাইছেন, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা এবং রাজ্য প্রশাসন একজোট হয়ে তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে দিতে চাইছে। তবে ইভিএম মেশিনে ‘জোড়াফুল’-এর বদলে ভোটারদের কাছে নতুন ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীককে জনপ্রিয় করা নিচুতলার কর্মীদের কাছে এক পর্বতপ্রমাণ চ্যালেঞ্জ। শুভেন্দুর ‘নাম-নিশান ওড়ানো’-র হুঙ্কার ব্যালট বাক্সে বুমেরাং হবে নাকি দিদির ফুটবল সত্যিই গোল করতে পারবে, সেটাই এখন ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সাসপেন্স।
