প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বিধানসভা নির্বাচনের পারদ যখন তুঙ্গে, ঠিক তখনই দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘির মাটি থেকে কার্যত রণহুঙ্কার ছাড়লেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধীদের কড়া বার্তা দিয়ে তিনি সাফ জানিয়ে দিলেন, রাজনীতির ময়দানে তিনি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ‘উদার’ নন। আগামী ৪ মে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রতিটি ‘অত্যাচারের’ পাই-পাই হিসেব নেওয়া হবে বলে হুঙ্কার দিয়েছেন তিনি। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে।
এদিন রায়দিঘির জনসভায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিশানায় ছিল মূলত কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি। গত কয়েক বছরে কেন্দ্রীয় এজেন্সির অতিসক্রিয়তা এবং তৃণমূল কর্মীদের ওপর হওয়া কথিত অত্যাচারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি। জনসভায় উপস্থিত কর্মীদের উদ্দীপ্ত করে অভিষেক বলেন, “অনেকে ভাবছেন অত্যাচার করে পার পেয়ে যাবেন। মনে রাখবেন, আমি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো উদার নই। ৪ তারিখের পর সব অত্যাচারের হিসেব হবে। যারা মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়েছে, তাদের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে বুঝে নেওয়া হবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, ৪ মের পর বাংলায় বিজেপির অস্তিত্ব সংকটে পড়বে এবং মানুষ ব্যালট বক্সে তার যোগ্য জবাব দেবে। রাজনৈতিক মহলের মতে, ‘৪ তারিখ’ এবং ‘হিসেবের’ কথা বলে তিনি কার্যত নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই আক্রমণাত্মক মেজাজকে কয়েক’টি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে বিশ্লেষণ করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বরাবরই সহনশীলতা ও সৌজন্যের রাজনীতির কথা বলেন। কিন্তু অভিষেক নিজেকে একজন ‘টাফ’ বা কঠোর নেতা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। “আমি মমতার মতো উদার নই”—এই বাক্যটির মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্ম এবং দলীয় ক্যাডারদের এই বার্তা দিতে চাইছেন যে, দল আক্রান্ত হলে তিনি হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। ভোটের মুখে যখন কেন্দ্রীয় এজেন্সির তৎপরতায় দলের অনেক নেতা-কর্মী কিছুটা কোণঠাসা বোধ করছেন, তখন এই ধরণের ‘হুঁশিয়ারি’ নিচুতলার কর্মীদের মনোবল বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয়। ‘পাল্টা হিসেব’ বুঝে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি আসলে কর্মীদের নির্বাচনী লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার সাহস দিচ্ছেন। ফলাফল ঘোষণার দিনক্ষণ উল্লেখ করে এই ধরণের মন্তব্য বিরোধীদের ওপর এক প্রকার মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করার কৌশল বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনার মতো তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটিতে দাঁড়িয়ে এই হুঙ্কার রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলাকে তৃণমূল কংগ্রেস তাদের অভেদ্য দুর্গ বলে মনে করে। বিধানসভা ভোটের মুখে সেই দুর্গে দাঁড়িয়ে অভিষেকের এমন মন্তব্য আসলে ভোটারদের এই বার্তা দেওয়া যে, তৃণমূল এখনও এই ময়দানে অপ্রতিরোধ্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আবেগ’ এবং অভিষেকের ‘আগ্রাসন’—এই দ্বিমুখী রণকৌশল ব্যবহার করে তিনি বিরোধী শিবিরকে নির্বাচনের আগেই ব্যাকফুটে ঠেলে দিতে চাইছেন।
সব মিলিয়ে, রায়দিঘির এই সভা থেকে অভিষেকের মন্তব্য কেবল একটি নির্বাচনী ভাষণ নয়, বরং আগামী ৪ মের পর রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ কোন দিকে যাবে, তার একটি স্পষ্ট পূর্বাভাস বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
