প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বাংলার সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে চিরকালই এক অদ্ভুত মাধুর্য ও বৈপরীত্যের সহাবস্থান দেখা গেছে। আদর্শের মঞ্চে তীব্র সংঘাত থাকলেও, পর্দার আড়ালে ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যের এক অনন্য ঐতিহ্য রয়েছে এই রাজ্যের। ১৯৫২ সালের স্মৃতি আজও উজ্জ্বল, যখন বিধানসভার অলিন্দে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায় স্বয়ং তরুণ বিরোধী দলনেতা জ্যোতি বসুর প্লেটে স্নেহের হাত বাড়িয়ে তুলে দিয়েছিলেন গরম লুচি। রাজনৈতিক মেরুকরণের শত ঝোড়ো হাওয়াতেও বাংলার সেই চিরায়ত সংসদীয় কৃষ্টি এবং ‘লুচি-কূটনীতি’ যে আজও হারিয়ে যায়নি— আজ বিধানসভার চত্বরে তারই এক জীবন্ত কোলাজ প্রত্যক্ষ করল রাজ্যবাসী।
প্রাক্তন শাসকদলের পতন এবং নতুন বিজেপি সরকারের শাসনকাল ঘিরে যখন বাংলার রাজনৈতিক আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, ঠিক তখনই জন্ম নিল এক অভূতপূর্ব নস্টালজিক নাটক। মুখোমুখি হলেন দুই হেভিওয়েট— একদিকে এ রাজ্যে সদ্য ক্ষমতায় আসা নতুন বিজেপি সরকারের দাপুটে মন্ত্রী তাপস রায়, অন্যদিকে বেলেঘাটার তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। আদর্শের কঠোর দেওয়াল ভেঙে দুই নেতার এই মার্জিত তরজা ও ‘লুচি-কূটনীতি’র রসায়নের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো।
বিধানসভার গেটে কুণাল ঘোষকে সামনে পেয়েই মৃদু হেসে প্রথম বাণটি ছোঁড়েন বিজেপি মন্ত্রী তাপস রায়। খোঁচা দিয়ে প্রশ্ন করেন, “ধর্মতলায় লোক হয়নি নাকি?” মুখ বাঁচাতে মরিয়া তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ সঙ্গে সঙ্গে অজুহাত দিয়ে বলেন, “তোমরা তো মঞ্চ বাঁধতেই দাওনি! ওয়াই চ্যানেলে আমাদের সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি।” ক্যাচ লুফে নিতে বিন্দুমাত্র সময় নেননি অভিজ্ঞ তাপস রায়। প্রাক্তন শাসকদলকে আইনের আয়না দেখিয়ে তিনি তাৎক্ষণিক স্মিতহাস্যে মনে করিয়ে দেন, “আমাদেরও তো অতীতে ১০৪ বার সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি, পারমিশন নিতে বার বার হাইকোর্টে যেতে হয়েছিল।”
রাজনৈতিক বাদানুবাদের মাঝেই মুহূর্তের মধ্যে সুর নরম করেন কুণাল ঘোষ। তাপস রায়ের কাঁধে হাত দিয়ে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বলেন, “সব সম্পর্ক রাজনীতি দিয়ে দেখবেন না। তাপসদা তো আমার কলেজে সিনিয়র।” এখানেই শেষ নয়, বিদায়বেলায় রীতিমত গদগদ হয়ে বিজেপি মন্ত্রীর ঘরোয়া আতিথেয়তা দাবি করে বসেন কুণাল। সরাসরি আবদার জুড়েন, “একদিন খাবার পাওনা রইল। বৌদিকে বোলো, লুচি আর পটল ভাজা পাওনা রইল।” ১৯৫২ সালে বিধানচন্দ্র রায় ও জ্যোতি বসুর সেই ঐতিহাসিক ‘লুচি-কূটনীতি’র স্মৃতি ফিরিয়ে এনে দুই নেতা হাসিমুখে হ্যান্ডশেক করেন।
তৃণমূলের অন্দরে যে তীব্র ভাঙন ও সমান্তরাল অক্ষ তৈরি হয়েছে, সেই আবহে কুণাল-তাপসের এই প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা অত্যন্ত ইঙ্গিতপূর্ণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ‘লুচি-পটল ভাজা’র আবদার কি শুধুই কলেজের সিনিয়রের প্রতি শ্রদ্ধা, নাকি ক্ষমতা হারিয়ে ডুবতে থাকা ঘাসফুল শিবিরের কোনো প্রভাবশালী অংশের নতুন বিজেপি সরকারের সাথে আগেভাগেই সেতু তৈরির প্রচ্ছন্ন চেষ্টা? বাইরে যতই সভার অনুমতি না মেলার নাটক চলুক, বিধানসভার অলিন্দে বিজেপির চাণক্য নীতির সামনে প্রাক্তন শাসকদলের এই প্রকাশ্য আতিথেয়তার আবদার প্রমাণ করছে— বাংলায় ঘাসফুলের দিন এবার সত্যিই শেষের মুখে।
