প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-বঙ্গ রাজনীতির এপিসেন্টার এখন ভবানীপুর। একদিকে হাইপ্রোফাইল কেন্দ্র, অন্যদিকে যুযুধান দুই শিবিরের স্নায়ুর লড়াই। কিন্তু ভোটযন্ত্রে জনতা রায়দানের আগেই কি রণে ভঙ্গ দিচ্ছে ঘাসফুল শিবির? বিদায়ী বিরোধী দলনেতা তথা বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর মনোনয়ন বাতিলের দাবি তুলে যেভাবে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হয়েছে, তাতে রাজনৈতিক মহলে উঠতে শুরু করেছে বড় প্রশ্ন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ময়দানে লড়াইয়ের জমি আলগা হতেই কি এখন ‘টেকনিক্যাল’ কারণে প্রতিপক্ষকে আটকানোর মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে শাসকদল?
ঘটনার সূত্রপাত গত ৩১ মার্চ। সিইও (CEO) দপ্তরের সামনে দুই শিবিরের বিএলও-দের সংঘর্ষ এবং বাইক ভাঙচুরের ঘটনায় যখন রণক্ষেত্রের চেহারা নিয়েছিল এলাকা, তখন শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয় ভূমিকার কথা বলেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, অশান্তি সৃষ্টিকারীদের রুখতে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বাহিনীকে কঠোর হতে হবে। কাশ্মীর মডেলে দুষ্কৃতীদের ‘সোজা’ করার যে দাওয়াই তিনি দিয়েছিলেন, তাকেই এখন ‘উস্কানি’ এবং ‘ভোটারদের ওপর হামলা’ হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে কমিশনের দরজায় কড়া নেড়েছে তৃণমূল। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, যারা আইন হাতে তুলে নিয়ে সরকারি দপ্তরের সামনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করল, তাদের আড়াল করতেই কি শুভেন্দুর ওপর এই আক্রমণ? নাকি অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট হওয়ার ভয়েই শুভেন্দুর ‘শান্তির দাওয়াই’কে ভয় পাচ্ছে শাসকদল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নন্দীগ্রামের ঐতিহাসিক পরাজয়ের স্মৃতি এখনও তৃণমূলের অন্দরে টাটকা। ভবানীপুরের মাটিতে দাঁড়িয়ে শুভেন্দু অধিকারী যখন সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ছেন, তখন লড়াই ময়দানে লড়ার বদলে কেন আইনি প্যাঁচে প্রতিপক্ষকে আটকানোর চেষ্টা হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে কৌতূহল বাড়ছে। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে লড়াই করার আত্মবিশ্বাস থাকলে কেন বারবার প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিলের মতো চরম পদক্ষেপের দাবি তোলা হচ্ছে? আইনজ্ঞদের মতে, যখন কোনো দল সুনিশ্চিত পরাজয় দেখতে পায়, তখনই তারা আইনি মারপ্যাঁচে প্রতিপক্ষকে মাঠের বাইরে রাখার চেষ্টা করে। তৃণমূলের এই ‘অভিযোগ-রাজনীতি’ আসলে তাদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা এবং ভবানীপুর হারানোর আতঙ্ককেই প্রকট করে তুলছে।
ভোট ঘোষণার পর কলকাতা পুলিশের কমিশনার পদ থেকে সুপ্রতিম সরকারকে সরিয়ে অজয় নন্দাকে বসিয়েছে নির্বাচন কমিশন। শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ ছিল, প্রশাসনের একাংশ এখনও নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে না এবং নির্দিষ্ট এক অফিসারের কথায় পরিচালিত হচ্ছে। তিনি দাবি করেছিলেন, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটের জন্য প্রশাসনের খোলনলচে বদলানো দরকার। শুভেন্দুর এই প্রশাসনিক স্বচ্ছতার দাবিকে তৃণমূল যেভাবে ‘উস্কানি’ বলে প্রচার করছে, তাতে সাধারণ ভোটারদের মনে প্রশ্ন জাগছে—তবে কি নিরপেক্ষ প্রশাসন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়াকড়ি হলে তৃণমূলের জেতার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে? অজয় নন্দার মত কড়া আইপিএস অফিসারকে নিয়ে শুভেন্দুর মন্তব্য কি তবে তৃণমূলের গোপন আঁতাতের ওপর আঘাত হেনেছে?
তৃণমূলের দাবি, শুভেন্দুকে শোকজ করা হোক এবং তাঁর প্রার্থীপদ বাতিল করা হোক। কিন্তু ভবানীপুরের অলিগলিতে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে অন্য সুর। সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, যারা অশান্তি রুখতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সক্রিয়তা চায়, তারা আমজনতার বন্ধু, দুষ্কৃতীদের শত্রু। তৃণমূলের এই অভিযোগ আসলে ‘উল্টো চোরকে কোতোয়াল’ সাজার সামিল। শুভেন্দু অধিকারী ভোটারদের ওপর হামলার কথা বলেননি, বরং ভোটারদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে বাহিনীর কঠোর হওয়ার কথা বলেছিলেন। যারা বুথ দখল বা ছাপ্পা ভোটের রাজনীতিতে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এই মন্তব্য ‘উস্কানি’ মনে হওয়াটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে, ভবানীপুরের লড়াই এখন আর শুধু ইভিএম-এ সীমাবদ্ধ নেই। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটাররাই ঠিক করবেন, তারা ‘শান্তির দাওয়াই’ চান নাকি ‘অশান্তির আড়াল’।
