প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
আরজিকর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে মৃত্যুমিছিল যেন থামছেই না। গত শুক্রবার হাসপাতালের ত্রুটিপূর্ণ লিফটে আটকে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যুর রেশ কাটতে না কাটতেই, আজ সোমবার ভোরে এক মুমূর্ষু রোগীকে স্ট্রেচার না দিয়ে হাঁটিয়ে শৌচালয়ে পাঠানোর অভিযোগ উঠলো। আর সেই পথেই অচৈতন্য হয়ে পড়ে মৃত্যু হলো বিশ্বজিৎ সামন্ত (৬০) নামে এক প্রৌঢ়ের। একের পর এক এই ঘটনা হাসপাতালের নূন্যতম পরিকাঠামো এবং প্রশাসনিক সংবেদনশীলতাকে ফের চরম কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
নিমতার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ সামন্তকে আজ ভোররাতে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আর জি করের ট্রমা কেয়ার সেন্টারে আনা হয়। পরিবারের দাবি, তাঁর বুকে তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট এবং নাক দিয়ে অনবরত রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। প্রাথমিক কিছু পরীক্ষার পর রোগী শৌচাগারে যাওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন। অভিযোগ, সেই সময় হাসপাতালের ভেতরে কোনো শৌচাগার ব্যবহারের অনুমতি না দিয়ে কর্তব্যরত কর্মীরা তাঁকে হাসপাতালের গেটের কাছে অবস্থিত একটি বাইরের ‘সুলভ’ শৌচালয়ে যেতে বলেন। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, ওই সংকটজনক অবস্থায় রোগীকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁরা বারবার একটি স্ট্রেচার বা হুইলচেয়ারের দাবি জানিয়েছিলেন। কিন্তু অভিযোগ, হাসপাতালের কর্মীরা তাঁদের সাফ জানিয়ে দেন যে কোনো স্ট্রেচার খালি নেই এবং রোগীকে হেঁটেই যেতে হবে। নিরুপায় হয়ে অসুস্থ প্রৌঢ়কে দুই পাশ থেকে ধরে হাঁটিয়েই নিয়ে যেতে বাধ্য হন পরিজনরা। ট্রমা কেয়ার থেকে শৌচালয়ে যাওয়ার পথেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন। তড়িঘড়ি তাঁকে স্ট্রেচারে করে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। মৃতের এক আত্মীয় ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “একজন মুমূর্ষু মানুষকে সামান্য স্ট্রেচারটুকু দেওয়া হলো না, এটা চিকিৎসা নয়, এটা সরাসরি প্রশাসনিক হত্যা।”
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটলো, যখন গত ২০ মার্চের লিফট দুর্ঘটনা নিয়ে গোটা রাজ্য উত্তাল। সেই ঘটনায় ৩ বছরের ছেলের চিকিৎসা করাতে এসে লিফটে পিষে মারা যান অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনায় ইতিমধ্যেই পুলিশ ৫ জনকে গ্রেফতার করেছে এবং লিফট রক্ষণাবেক্ষণে চরম গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। ২০২৪ সালের অগস্ট মাসে এক নারী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার পর হাসপাতালের নিরাপত্তা ও পরিকাঠামো উন্নয়নের যে বিশাল প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সাম্প্রতিক এই মৃত্যুগুলি প্রমাণ করছে যে, বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। এক দিকে বিকল লিফট মানুষের প্রাণ কাড়ছে, অন্যদিকে জরুরি বিভাগে আসা রোগীর জন্য একটি স্ট্রেচার পর্যন্ত জুটছে না— এই চরম অব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ এখন চরমে পৌঁছেছে।
বিশ্বজিৎ সামন্তের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই হাসপাতাল চত্বরে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়ায়। কেন ট্রমা কেয়ারের মতো অতি-সংবেদনশীল বিভাগে পর্যাপ্ত স্ট্রেচার নেই বা কেন রোগীকে বাইরের শৌচালয়ে যেতে বাধ্য করা হলো, তা নিয়ে রহস্য দানা বাঁধছে। আরজিকরের এই বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি হাসপাতালের ব্যর্থতা নয়, বরং তা গোটা সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
