প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
২০২৬-এর মহাযুদ্ধের দামামা বাজার পরেই বাংলার রাজনৈতিক আকাশ কার্যত আগ্নেয়গিরির রূপ ধারণ করেছে। মঙ্গলবার বিকেলে কলকাতায় রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (CEO) দপ্তরের সামনে যে নজিরবিহীন বিশৃঙ্খলা তৈরি হলো, তা ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর একটি বিস্ফোরক ‘নিদান’। অশান্তি রুখতে এবং বিশৃঙ্খলাকারীদের দমনে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সরাসরি ‘অ্যাকশন’ মুডে আসার পরামর্শ দিয়ে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন— “সোজা করে দেওয়ার টাইম শুরু হয়ে গিয়েছে।”
মঙ্গলবার দুপুরের পর থেকেই সিইও দপ্তরের সামনে উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছিল। একদিকে ভোটার তালিকায় ব্যাপক কারচুপি ও নিয়ম বহির্ভূতভাবে নাম নথিভুক্তকরণের অভিযোগে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল ডেপুটেশন দিতে পৌঁছান। ঠিক সেই সময়ই সেখানে উপস্থিত তৃণমূলপন্থী বিএলও (BLO) এবং অস্থায়ী কর্মীদের একটি বড় অংশ শুভেন্দুর গাড়ি ঘিরে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের প্রবল ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও উত্তেজনার আঁচ এতটাই বেশি ছিল যে, পরিস্থিতি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। পুলিশের সঙ্গেও দু’পক্ষের কর্মী-সমর্থকদের ধস্তাধস্তি চলে। এই চরম উত্তেজনার মাঝেই সিইও দপ্তরে নিজের নালিশ জানিয়ে বেরিয়ে আসেন শুভেন্দু অধিকারী।
দপ্তর থেকে বেরিয়েই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রণংদেহি মেজাজে ধরা দেন শুভেন্দু। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্রমাগত কেন্দ্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে জনতাকে উস্কানি দিচ্ছেন এবং রাজ্য পুলিশ ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকছে। এই অরাজকতা রুখতে তিনি কেন্দ্রীয় বাহিনীকে দয়া-মায়া ত্যাগ করার পরামর্শ দেন।সরাসরি কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “কেন্দ্রীয় বাহিনীকে পেটাতে হবে, গ্যাস ফাটাতে হবে। ভালো করে পেটালে সব সোজা হয়ে যাবে।” বাহিনীর শক্তির ওপর আস্থা রেখে তিনি আরও যোগ করেন, “ওদের হাতে লাঠি আছে তো। বন্দুক ব্যবহারের দরকার নেই, লাঠি ব্যবহার করলেই ঠিক হয়ে যাবে।” এখানেই থামেননি তিনি। বাংলার বর্তমান পরিস্থিতিকে জম্মু ও কাশ্মীরের সঙ্গে তুলনা করে বিরোধী দলনেতা হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “আরে কাশ্মীর সোজা করে দিয়েছে, এখানেও সোজা করতে দিতে হবে তো!” শুভেন্দুর এই মন্তব্যের অর্থ পরিষ্কার— তিনি চান ভোটের আগে এবং চলাকালীন কেন্দ্রীয় বাহিনী যেন কোনোভাবেই নমনীয় না হয়। যারা আইন হাতে তুলে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে বাহিনীর কঠোর ‘স্ট্রাইকিং মোড’ দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন তিনি।
শুভেন্দু অধিকারীর এই ‘মারকুটে’ দাওয়াই মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু মূলত কেন্দ্রীয় বাহিনীর মনোবল বাড়াতে এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ভয় কাটাতে এই ধরনের আক্রমণাত্মক কৌশল নিয়েছেন। শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য এই মন্তব্যকে ‘উস্কানিমূলক’ এবং ‘গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ’ বলে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছে। তাদের দাবি, শুভেন্দু অধিকারী হিংসা ছড়িয়ে বাংলায় অস্থিরতা তৈরি করতে চাইছেন। অন্যদিকে, বিজেপি নেতৃত্বের দাবি— “শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য মারের মুখে মারই একমাত্র ওষুধ।”
মঙ্গলবার বিকেলের এই ঘটনার পর রাজ্য জুড়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসবে, এই উত্তেজনা যে আরও বাড়বে তার ইঙ্গিত শুভেন্দু অধিকারী গতকালই দিয়ে রেখেছেন। এখন দেখার, নির্বাচন কমিশন এই বিস্ফোরক মন্তব্যের প্রেক্ষিতে কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেয় কিনা। তবে এটুকু নিশ্চিত, ধর্মতলার রাজপথ থেকে দেওয়া শুভেন্দুর এই ‘কাশ্মীরি দাওয়াই’ মে মাসের নির্বাচনের আগে রাজ্য রাজনীতিতে এক নতুন মেরুকরণের সৃষ্টি করলো।
