প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভারতের নির্বাচন কমিশনের (ECI) অভ্যন্তরীণ নজিরবিহীন সংঘাত এবার দেশের সর্বোচ্চ আদালতের দোরগোড়ায় পৌঁছলো। বাকি দুই নির্বাচন কমিশনারের লিখিত আপত্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্পূর্ণ একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আজ সুপ্রিম কোর্টে একটি বিস্ফোরক রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী (অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড চাঁদ কুরেশির মাধ্যমে) এই জনস্বার্থ মামলাটি (Diary No. 59734/2026) দাখিল করেছেন। পিটিশনে জ্ঞানেশ কুমারের নেওয়া সমস্ত বিতর্কিত ও একতরফা সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করার জোরালো দাবি জানানো হয়েছে।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়া নির্বাচন কমিশনের গোপন নথি অনুযায়ী জানা গেছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR), ভোটার ডাটাবেস সেন্ট্রালাইজেশন এবং ফরম ৬ (Form 6) সংশোধনসহ একাধিক স্পর্শকাতর বিষয়ে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী গত ১০ মাসে অন্তত ১৪ বার অন-রেকর্ড লিখিত আপত্তি (Dissent Notes) জানিয়েছিলেন। আজ দায়ের হওয়া সুপ্রিম কোর্টের পিটিশনে স্পষ্ট যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, সংবিধানের ৩২৪(২) অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের নির্বাচন কমিশনার আইনের ধারা ১৮ অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Majority Concurrence) ভিত্তিতে হওয়া বাধ্যতামূলক। যেহেতু বাকি দুই কমিশনারের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে সিইসি জ্ঞানেশ কুমার সম্পূর্ণ একতরফাভাবে এই নির্দেশগুলি কার্যকর করেছেন, তাই তাঁর নেওয়া সমস্ত সিদ্ধান্তকে আইনিভাবে অবৈধ ও বাতিল (Null and Void) ঘোষণা করার আরজি জানানো হয়েছে।
এই পিটিশনে শুধু সিদ্ধান্ত বাতিলই নয়, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়ার আড়ালে দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম রহস্যজনকভাবে বাদ পড়া নিয়ে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (SIT) গঠনের দাবি জানানো হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে এই কমিটি দ্বারা ECINet এবং ERONet ডাটাবেসের একটি ফরেনসিক অডিট করার আরজিও জানিয়েছেন আবেদনকারী। পাশাপাশি, পশ্চিমবঙ্গ অ্যাপেলিয়েট ট্রাইব্যুনালে নির্বাচন কমিশনের নাম ব্যবহার করে ভোটারদের অন্তর্ভুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে যে ১৬.১০ লক্ষ আপিল বা মামলা দায়ের করা হয়েছিল, সেটিকেও সম্পূর্ণ অননুমোদিত আখ্যা দিয়ে বাতিল করার দাবি উঠেছে এই পিটিশনে।
মামলাটিতে সবচেয়ে বড় আইনি মোচড় দেওয়া হয়েছে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সুরক্ষা নিয়ে। পিটিশনে উল্লেখ করা হয়েছে, সংবিধানের ৩৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কেবল দেশের রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালরাই ফৌজদারি মামলা থেকে বিশেষ সুরক্ষা পান। সিইসি-র ক্ষেত্রে পদের নিরাপত্তা (Security of Tenure) থাকলেও ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়বদ্ধতা থেকে কোনও আইনি ছাড় নেই।ভোটার তালিকা জালিয়াতি ও সরকারি নথির অপব্যবহার করার অপরাধে জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০-এর ধারা ৩২ এবং ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) অনুযায়ী জ্ঞানেশ কুমারকে একজন সাধারণ আসামির মতো পুলিশি তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং নিয়মিত ট্রায়ালের মুখোমুখি করার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে আগে এক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছিল যে, কোনো অভ্যন্তরীণ কোন্দল নেই এবং সমস্ত সিদ্ধান্তই সর্বসম্মতভাবে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টে সরাসরি এই ফৌজদারি ও সাংবিধানিক পিটিশন দায়ের হওয়ার পর জ্ঞানেশ কুমারের ওপর আইনি ও রাজনৈতিক চাপ যে বহুগুণ বেড়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য।
