প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। খোদ ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (CEC) জ্ঞানেশ কুমারের প্রশাসনিক ক্ষমতা ও কর্তৃত্বকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দায়ের হওয়া একটি জনস্বার্থ মামলা শুনতে রাজি হলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত। আজ, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) ভারতের প্রধান বিচারপতি নেতৃত্বাধীন বেঞ্চে এই মামলার দ্রুত শুনানির আর্জি জানানো হলে, আদালত আগামী সপ্তাহে মামলাটি তালিকাভুক্ত করতে সম্মত হয়েছে। সামাজিক কর্মী রাকেশ কুমার সিংয়ের পক্ষে সুপ্রিম কোর্টের বরিষ্ঠ আইনজীবী বিকাশ সিং, আইনজীবী সুদীপ চন্দ্র এবং মুদিত গুপ্ত শীর্ষ আদালতে এই তীব্র আইনি লড়াইয়ের সূচনা করেছেন।
মামলার মূল অভিযোগে বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবিধানের ৩২৪(৩) অনুচ্ছেদ এবং ২০২৩ সালের নতুন নির্বাচন কমিশনার আইন (Section 18 of the 2023 Act) অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন একটি বহু-সদস্য বিশিষ্ট যৌথ সংস্থা। কমিশনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয় সর্বসম্মত হতে হবে, অন্যথায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার (Majority) ভিত্তিতে হতে হবে। সিইসি কোনো একক মালিক নন, তিনি কেবল কমিশনের চেয়ারম্যান। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সিইসি জ্ঞানেশ কুমার বাকি দুই নির্বাচন কমিশনার—সুখবীর সিং সান্ধু (Sukhbir Singh Sandhu) এবং বিবেক জোশীর (Vivek Joshi) মতামত বা অনুমোদন ছাড়াই সম্পূর্ণ একতরফাভাবে এবং একনায়কতান্ত্রিক উপায়ে একের পর এক বড় সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টে দায়ের হওয়া এই পিটিশনটিতে দেশব্যাপী চালানো ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) বা ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে মারাত্মক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় দেশজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি (130 Million) ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। অভিযোগ, বিগত ১০ মাসে নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বৈঠকে বাকি দুই কমিশনার এই ভোটার তালিকার বিশুদ্ধতা ও ডিজিটাল ডেটাবেসের নিরাপত্তা নিয়ে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি ও তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কমিশনার বিবেক জোশী আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন যে, নির্বাচন কমিশনের ভোটার ডাটাবেস কেন্দ্রীয়করণ করার ফলে নির্দিষ্ট বিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ ছাড়া অন্য বাইরের কেউ তাতে হস্তক্ষেপ করছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে অডিট প্রয়োজন। পরবর্তীতে কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধুও অভিযোগ করেন যে, রাজ্য স্তরের নির্বাচনী অফিসারদের ‘ERONet’ পোর্টালে সম্পূর্ণ অ্যাক্সেস দেওয়া হচ্ছে না। কিন্তু এই সমস্ত আপত্তিকে পাত্তা না দিয়ে সিইসি একতরফা নির্দেশ জারি করেছেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের জুডিশিয়াল অফিসারদের নির্দেশে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রায় ১৬.১০ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য নির্বাচন কমিশনের নামে উচ্চ আদালতে আপিল ফাইল করা হয়েছিল। গত ১২ আগস্ট ২০২৬-এর একটি অফিসিয়াল নোটে কমিশনার সান্ধু খোদ প্রশ্ন তোলেন—”নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এই বিপুল সংখ্যক ভোটারের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করার অনুমতি কে এবং কখন দিয়েছিল?” এই রহস্যময় অনুমোদনের নথিপত্রও আদালতের সামনে পেশ করার দাবি জানানো হয়েছে।
মামলাটিতে সুপ্রিম কোর্টের কাছে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে একাধিক অভূতপূর্ব নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত জ্ঞানেশ কুমারকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ এবং দৈনন্দিন সমস্ত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত বা সাময়িকভাবে বরখাস্ত (Suspend) রাখা হোক। এই অন্তর্বর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের সমস্ত কাজ যাতে বাকি দুই কমিশনার সান্ধু ও জোশীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, সেই নির্দেশ দেওয়া হোক। বিগত মাসের সমস্ত এজেন্ডা, মিটিংয়ের কার্যবিবরণী (Minutes), ফাইল নোটিং, আইটি অ্যাক্সেস রেকর্ড এবং সার্ভার লগ যাতে কোনোভাবেই নষ্ট বা প্রমাণ লোপাট না করা যায়, সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে তা সংরক্ষণ করা হোক।
অবশ্য গত ২৩ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, কমিশনের সমস্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনেই নেওয়া হয়। অভ্যন্তরীণ স্তরে ভিন্ন মত প্রকাশ বা নোট আদান-প্রদান করাটা একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ। সব মিলিয়ে, নির্বাচন কমিশনের ভেতরের এই বেনজির ফাটল এবং ১৩ কোটি ভোটারের ভাগ্য এবার সুপ্রিম কোর্টের দরজায় পৌঁছানোয়, আগামী সপ্তাহের শুনানির দিকে দেশবাসীর নজর থাকবে।
