Site icon প্রিয় বন্ধু মিডিয়া

ভাইপো-স্নেহের অন্ধ অহংকারেই কি ডুবল দল? শুভেন্দুকে অবহেলা না করলে আজ কি খেসারত দিতে হতো মমতাকে?

 

 

প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতির দাবার বোর্ডে একটা ভুল চাল কীভাবে গোটা সাম্রাজ্যকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে, পশ্চিমবঙ্গ আজ তার জীবন্ত সাক্ষী। রাজ্যে এখন ক্ষমতার অলিন্দে নতুন সূর্য—মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে আসীন একদা মেদিনীপুরের ‘ভূমিপুত্র’ শুভেন্দু অধিকারী। অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ফ্রিজ হওয়ার পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২৮ বছরের রাজনৈতিক সাম্রাজ্য আজ খাদের কিনারায়। এই ঐতিহাসিক পটপরিবর্তনের পর রাজনৈতিক মহলে একটি বিস্ফোরক প্রশ্ন আছড়ে পড়ছে—২০২০ সালের সেই পড়ন্ত ডিসেম্বরে শুভেন্দু অধিকারী যদি দল না ছাড়তেন, তবে কি আজ মমতাকে এই চরম পরিণতি দেখতে হতো? নাকি ভাইপো-স্নেহে অন্ধ থাকাই কাল হলো তৃণমূল সুপ্রিমোর?

তৃণমূলের অন্দরের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, শুভেন্দু অধিকারী কেবল একজন সাধারণ নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন আক্ষরিক অর্থেই আস্ত এক ‘অর্গানাইজেশনাল মেশিন’। জঙ্গলমহল থেকে শুরু করে দুই মেদিনীপুর, মুর্শিদাবাদ ও মালদহে দলের সংগঠন নিজের কাঁধে খাড়া করেছিলেন তিনি। কিন্তু ২০১৫ সালের পর থেকেই দলের অন্দরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্পোরেট কায়দায় দল চালানোর প্রক্রিয়া শুরু হতেই শুভেন্দুর মতো মাটির নেতাদের কোণঠাসা করার খেলা শুরু হয়। তৃণমূলের তৎকালীন বহু প্রবীণ নেতাই এখন আড়ালে স্বীকার করছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি সময় থাকতে শুভেন্দুর মান-অভিমান ও গুরুত্বকে মান্যতা দিতেন এবং ভাইপো-স্নেহে অন্ধ না হয়ে তাঁর হাতেই দলের প্রকৃত সাংগঠনিক ব্যাটন তুলে দিতেন, তবে শুভেন্দুকে কোনোদিন দল ছাড়তে হতো না। শুভেন্দুর দলত্যাগই আসলে তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গে প্রথম ও সবচেয়ে বড় ফাটল ধরিয়েছিল।

শুভেন্দু অধিকারী দল ছাড়ার পর শুধু নিজেই যাননি, সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন বুথ স্তরের হাজার হাজার দক্ষ ও বিশ্বস্ত কর্মীকে। ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি পরাজিত করে তিনি প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে, বাংলায় মরণপণ লড়াই দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর রয়েছে। পরবর্তীতে বিরোধী দলনেতা হিসেবে বিধানসভার ভেতরে ও বাইরে যেভাবে তিনি তৎকালীন শাসকদলকে একের পর এক আইনি ও রাজনৈতিক চালে কোণঠাসা করেছেন, তাতেই তৃণমূলের ভিত নড়ে গিয়েছিল।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, শুভেন্দুর কাছে তৃণমূলের কোন নেতা কোথায় দুর্বল, কার কী হাঁড়ির খবর—সব নখদর্পণে ছিল। ফলে সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় আঘাত হেনে তিনি রাজ্য রাজনীতিতে বিজেপিকে এমন এক জায়গায় নিয়ে যান, যার চূড়ান্ত পরিণতি আজকের এই ক্ষমতার অলিন্দ বদল এবং তাঁর মুখ্যমন্ত্রী পদে উত্থান।

আজ যখন তৃণমূলের মূল নাম ও প্রতীক নির্বাচন কমিশন ফ্রিজ করে দিয়েছে, তখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে দলে কোনো ‘হেভিওয়েট ক্রাইসিস ম্যানেজার’ ছিলেন না। শুভেন্দুর মতো মাস-লিডার যদি আজ মমতার পাশে থাকতেন, তবে দলের ভেতরে এই স্তরের বিদ্রোহ বা আড়াআড়ি ফাটল তৈরি হওয়া অসম্ভব ছিল। শুভেন্দুর হাত ধরে যে শক্তির উত্থান বঙ্গে ঘটল, তা আজ তাঁকে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসিয়েছে, আর অন্যদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে লড়তে হচ্ছে নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব বাঁচানোর শেষ লড়াই। ইতিহাসের পাতায় এই অধ্যায়টি সবসময় লেখা থাকবে—জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও কেবল উত্তরসূরি নির্বাচনের ভুল সিদ্ধান্ত এবং যোগ্য সেনাপতিকে অবমূল্যায়ন করার কারণেই কীভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল একদা অপরাজেয় এক রাজনৈতিক সাম্রাজ্য।

Exit mobile version