প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-তারাতলার নির্মীয়মাণ গুদাম ধসের ঘটনায় এবার চরম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংঘাতের আবহ তৈরি হলো রাজ্য রাজনীতিতে। বৃহস্পতিবার বিধানসভার বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখার সময় এই বিপর্যয়কে সরাসরি পূর্বতন তৃণমূল সরকারের ‘আমলের পাপ’ বলে তীব্র আক্রমণ শানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বিধানসভার কক্ষে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী একটি ফাইল উঁচিয়ে ধরে বলেন, “এই দেখুন ফিরহাদ হাকিমের সই! স্ট্রাকচারে চরম গাফিলতি এবং নকশায় গলদ থাকা সত্ত্বেও এই প্ল্যান টাকার বিনিময়ে অনুমোদন করা হয়েছিল”।
তারাতলার ট্রান্সপোর্ট ডিপো রোডের এই গুদাম বিপর্যয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১-তে। লোহার ভারী কাঠামো ও ছাদের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বেশ কিছু শ্রমিকের আটকে থাকার আশঙ্কা করা হচ্ছে। সেনা, এনডিআরএফ (NDRF), ডিএমজি (DMG) এবং সিভিল ডিফেন্সের দল যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। এই ট্র্যাজেডি প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “টাকা নিতে নিতে ‘সিটি অফ জয়’ কলকাতাকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে ফেলেছে তৃণমূল সরকার। গার্ডেনরিচ কাণ্ড থেকেও এরা কোনো শিক্ষা নেয়নি।” তিনি তথ্যপ্রমাণ দিয়ে জানান, চলতি ২০২৬ সালের ১৭ জানুয়ারি তৃণমূল জমানায় এই ত্রুটিপূর্ণ বিল্ডিং প্ল্যানের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যেখানে কলকাতা পুরসভার তৎকালীন মেয়র ফিরহাদ হাকিম স্বয়ং স্বাক্ষর করেছিলেন।
তদন্তে কোনো রাজনৈতিক রং দেখা হবে না স্পষ্ট করে মুখ্যমন্ত্রী নিশানা করেছেন ফিরহাদ হাকিমের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ তথা পুরসভার ওএসডি (OSD) ‘কালী’ ওরফে কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, “এই কালীকে জেরা করলেই অনেক তথ্য সামনে আসবে। কার নির্দেশে এবং কত টাকার বিনিময়ে এই সমস্ত নিয়মবহির্ভূত নকশা পাশ হতো, তা স্পষ্ট হয়ে যাবে।” কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে পুরসভার সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার আমিনুর শেখ, অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার নির্মলেন্দু সরকার এবং কার্যনির্বাহী ইঞ্জিনিয়ার রঞ্জন দাসের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই বিভাগীয় ও আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ঘটনার তদন্তে নেমে কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (SIT) ইতিমধ্যেই ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছে:গুলজার হোসেন (বিল্ডিং কন্ট্রাক্টরের সুপারভাইজার) কমল সামন্ত (আয়রন স্ট্রাকচার ফ্যাব্রিকটের) শম্ভুনাথ বেহেরা (জমির লিজ গ্রহীতা) দিবাকর ভাণ্ডারী (শ্রমিক সরবরাহকারী ও ট্রিম্যাক্স ঠিকাদার) আব্দুল হামিদ (পুরসভার প্ল্যান পাশ করানোর দালাল) প্রধান অভিযুক্ত তথা মূল কন্ট্রাক্টর আসগরের খোঁজে জোরদার তল্লাশি চলছে। মুখ্যমন্ত্রীর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “দোষীদের সম্পত্তি সংযুক্ত (Attach) করে সেই টাকা থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে এবং অপরাধীদের জেলে খাটানো হবে। সরকারের নীতি জিরো টলারেন্স।”
বিপর্যয়ের জেরে বড়সড় পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে নবান্ন। কলকাতা, রাজারহাট-নিউটাউন, মহেশতলা, সোনারপুর ও বারুইপুর সহ পার্শ্ববর্তী সমস্ত এলাকায় আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত সমস্ত বেসরকারি ও বাণিজ্যিক বহুতলের নির্মাণ কাজ স্থগিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে আইআইটি (IIT), আরআইটিইএস (RITES) এবং পূর্ত দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স তৃণমূল জমানায় পাশ হওয়া সমস্ত বিল্ডিং প্ল্যানের সুরক্ষা অডিট (Safety Audit) করবে। অডিট রিপোর্ট সন্তোষজনক না হলে কোনো কাজ পুনরায় শুরু করতে দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সরকার।
