প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-রাজনীতিতে একটা কথা খুব চালু আছে—জাহাজ যখন ডুবতে শুরু করে, তখন নাকি সবচেয়ে আগে চতুর যাত্রীরা নিরাপদ ডাঙ্গার খোঁজে ছটফট করে। বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণে ২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফলের পর যে নজিরবিহীন ঐতিহাসিক ওলটপালট ঘটে গেছে, তার রেশ যেন কাটতেই চাইছে না। নবান্নের ক্ষমতা বদলের পর এবার আসল ভাঙনটা স্পষ্ট হয়ে গেল খোদ বিধানসভার অন্দরে। ৮০ জন তৃণমূল বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন সোজা বিদ্রোহ ঘোষণা করে স্পিকারের দ্বারস্থ হলেন এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে বেছে নিলেন নতুন বিরোধী দলনেতা হিসেবে। এই বিরাট ভাঙন এবং নতুন পরিষদীয় ফ্রন্ট গঠনের পরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে এক তীব্র জল্পনা। আর ঠিক এই উত্তাল আবহের মাঝেই, রাজনৈতিক দূরদর্শিতার এক অসামান্য পরিচয় দিয়ে ময়দানে নামলেন বিজেপি বিধায়ক তথা নবনিযুক্ত মন্ত্রী প্রবীণ চিন্তাবিদ স্বপন দাশগুপ্ত। নিজের এক্স হ্যান্ডলে অত্যন্ত মার্জিত অথচ কামানের গোলার মতো তীক্ষ্ণ ভাষায় এক দীর্ঘ পোস্ট করেছেন তিনি। নতুন বিজেপি জমানার অলিন্দে যাতে কোনোভাবেই সুবিধাবাদী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ না ঘটে, তার জন্য দলের কর্মীদের এক মহাকড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন তিনি।
তৃণমূলের পরিষদীয় দলে এই নজিরবিহীন বিদ্রোহ এবং নতুন বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের ঘটনার পর রাজনৈতিক মহলের অন্দরে কান পাতলেই এখন একটা বড় প্রশ্ন চাবুকের মতো ধেয়ে আসছে—এই নতুন ফ্রন্ট গঠন কি সত্যিই কোনো আদর্শের লড়াই, নাকি স্রেফ বিগত দিনের নানা রাজনৈতিক দায় এবং বিতর্ক এড়ানোর একটা নিরাপদ কৌশল? যখনই কোনো রাজনৈতিক শিবিরে ক্ষমতার হাতবদল ঘটে, তখন রাতারাতি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখার এই মরিয়া চেষ্টা আসলে কিসের ইঙ্গিত দেয়? স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর পোস্টে বিন্দুমাত্র রাখঢাক না রেখে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, পরাজিত তৃণমূলের এই অভ্যন্তরীণ কামড়াকামড়ি বা আত্মধ্বংসের প্রক্রিয়া নিয়ে বিজেপির কোনো মাথাব্যথা নেই, কোনো সহানুভূতিও নেই। কিন্তু তাঁর আসল উদ্বেগ ভারতীয় জনতা পার্টির নিজস্ব আদর্শগত শুদ্ধতা নিয়ে। তৃণমূলের যে ‘গুন্ডামির রাজনৈতিক সংস্কৃতি’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিজেপি রাজপথে লড়াই করেছে, তা যেন কোনোভাবেই বিজেপির অন্দরে প্রবেশ করতে না পারে, সেই দিকেই তাঁর মূল নজর।
সবচেয়ে বড় আক্রমণটি তিনি শানিয়েছেন সেই সমস্ত সুযোগসন্ধানী দলবদলুদের দিকে, যারা পরিস্থিতি বুঝে রাতারাতি ভোল বদলে নতুন শাসকদল বিজেপির কাছাকাছি আসার চেষ্টা করছে। দলীয় কর্মীদের উদ্দেশ্যে তাঁর স্পষ্ট হুঁশিয়ারি, “আমাদের সব সময় নকল বন্ধুদের থেকে সাবধান থাকতে হবে।” যাঁরা নিজেদের অতীত আড়াল করার তাগিদে বিজেপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়াতে চাইছেন, তাঁদের থেকে দূরত্ব বজায় রাখার এক প্রচ্ছন্ন নির্দেশ রয়েছে তাঁর এই লেখনীতে।স্বপনবাবুর ভাষায়, “পশ্চিমবঙ্গের শুদ্ধিকরণ অসম্পূর্ণ রাখা যাবে না।” অর্থাৎ, স্রেফ নবান্নের ক্ষমতা দখল করাই শেষ কথা নয়। বাংলার সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্তরে যে অবক্ষয় দেখা দিয়েছিল, তার আমূল সংস্কার প্রয়োজন। স্রেফ দল ভেঙে নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে পার পাওয়া যাবে না; রাজনৈতিক সংস্কৃতির এই শুদ্ধিকরণ বা ‘ডিটক্স’ প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে।
রাজনীতিতে ক্ষমতার হাতবদল হতেই পারে, কিন্তু সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।
স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর এই ক্ষুরধার পোস্টের মাধ্যমে দলের কর্মীদের এটাই মনে করিয়ে দিলেন যে—বেনো জল ঢুকে যাতে আসল পুকুরের জল নষ্ট না করে। সুবিধাবাদীদের জায়গা দিয়ে দলের আসল আদর্শকে যেন কোনোভাবেই কালিমালিপ্ত করা না হয়।
