প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
“টাকার কাছে আমি হেরে গেলাম”— তৃণমূলের দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সৈনিক তথা রাজগঞ্জের চারবারের বিধায়ক খগেশ্বর রায়ের এই একটি মাত্র বাক্যেই এখন সরগরম রাজ্য রাজনীতি। গতকাল কালীঘাট থেকে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হয়েছে, তাতে রাজগঞ্জ আসনে খগেশ্বরবাবুর নাম না থাকায় কার্যত বজ্রপাত হয়েছে তাঁর অনুগামীদের মধ্যে। ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন এলাকার তৃণমূল কর্মীরা। শুধু তাই নয়, দীর্ঘদিনের অপমানের বদলা নিতে এবং দলের এই ‘টিকিট বিক্রির’ সংস্কৃতির প্রতিবাদ জানিয়ে তৎক্ষণাৎ জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফার কথা ঘোষণা করেছেন খগেশ্বর বাবু। এখন প্রশ্ন উঠছে, খগেশ্বরের বিদ্রোহে বিজেপির পথ পরিষ্কার?
রাজগঞ্জের রাজনীতিতে খগেশ্বর রায় এক পরিচিত মুখ। কিন্তু ২০২৬-এর নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে সরিয়ে প্রার্থী করেছেন এশিয়াডে সোনাজয়ী অ্যাথলিট স্বপ্না বর্মনকে। নিজের দলের নেত্রীর এই সিদ্ধান্তে হতভম্ব বিধায়ক খগেশ্বর রায়। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বিধায়ক থাকার পরেও যেভাবে তাঁকে ব্রাত্য করা হলো, তাতে তিনি চরম হতাশ। খগেশ্বরবাবুর অনুগামীদের দাবি, “যিনি বছরের পর বছর মাটি কামড়ে লড়াই করলেন, তাঁকে সরিয়ে হঠাৎ করে এক সেলিব্রিটিকে উড়ে এসে জুড়ে বসানো হলো কেন? এর পিছনে কি কোনো বড়সড় আর্থিক লেনদেন রয়েছে?” খগেশ্বরবাবুর নিজের মুখে “টাকার কাছে হার” স্বীকার করে নেওয়া সেই জল্পনাকেই উস্কে দিচ্ছে।
তবে খগেশ্বর রায়ের এই বিদ্রোহ রাজগঞ্জ আসনে বিজেপির পাল্লাকে কয়েক গুণ ভারী করে দিয়েছে। গত কয়েকটি নির্বাচনের পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায় যে, রাজগঞ্জে তৃণমূলের আধিপত্য ক্রমেই কমছে এবং বিজেপি সেখানে কড়া টক্কর দিচ্ছে। ২০২১ খগেশ্বর রায় জয়ী হলেও বিজেপির সুপেন রায় কড়া টক্কর দিয়েছিলেন। খগেশ্বর রায়ের জয়ের ব্যবধান ছিল মাত্র ১৫,৭৭৩ ভোট। যেখানে সুপেন রায় পেয়েছিলেন ৮৮,৮৬৮ ভোট। ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে এই বিধানসভা এলাকা থেকে তৃণমূল মাত্র ৪,৩২০ ভোটে এগিয়ে ছিল, যেখানে বিজেপির জয়ন্ত কুমার রায় ব্যাপক ভোট টেনেছিলেন। ফলে দেখাই যাচ্ছে, প্রতি নির্বাচনেই বিজেপি রাজগঞ্জে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছে। এবার যখন খগেশ্বর রায়ের মত পোড়খাওয়া নেতা টিকিট না পেয়ে বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন এবং তাঁর অনুগামীরা দলের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন, তখন তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক যে ব্যাপক হারে ভাঙতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য। আর তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ এই কোন্দলের ফায়দা তুলতেই কোমর বাঁধছে বিজেপি শিবির।
স্বপ্না বর্মন কি পারবেন তৃণমূলের এই ক্ষোভ সামলাতে? তৃণমূলের অন্দরের গুঞ্জন, উত্তরবঙ্গে বিজেপির দাপট রুখতে ‘চমক’ দিতেই স্বপ্না বর্মনকে প্রার্থী করা হয়েছে। কিন্তু খগেশ্বর রায়ের অনুগামীরা বলছেন, “মাঠের দৌড় আর রাজনীতির ময়দান এক নয়।” স্থানীয় স্তরে সংগঠনহীন এক প্রার্থীকে নিয়ে রাজগঞ্জের মত গুরুত্বপূর্ণ আসন পুনরুদ্ধার করা তৃণমূলের পক্ষে কার্যত অসম্ভব হতে চলেছে। বাংলার রাজনীতির কারবারিরা মনে করছেন, মমতার এই ‘সেনাপতি’র বিস্ফোরক পদত্যাগ এবং টাকার বিনিময়ে টিকিট দেওয়ার অভিযোগ ২০২৬-এর নির্বাচনে তৃণমূলের কফিনে শেষ পেরেক হতে পারে। রাজগঞ্জের মানুষ এখন তৃণমূলের এই ‘টিকিট কেনা-বেচার’ রাজনীতির যোগ্য জবাব দিতে প্রস্তুত।
