প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় নিজের প্রিয় চত্বরে পা রেখেই এক মহাবিস্ফোরণ ঘটালেন নির্বাসিত সমাজকর্মী তথা বহুচর্চিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন। গতকাল, ২ আগস্ট ২০২৬ (রবিবার), কলকাতায় আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পাশাপাশি প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের আইন ব্যবস্থা নিয়ে এক নজিরবিহীন ও বৈপ্লবিক দাবি তুলেছেন তিনি। পশ্চিমবঙ্গের নতুন বিজেপি সরকার রাজ্যে ইতিমধ্যেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে, আর ঠিক এই আবহেই ইউসিসি-র পক্ষে সরাসরি এবং অত্যন্ত জোরালো সওয়াল করলেন তসলিমা।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তসলিমা নাসরিন স্পষ্ট ভাষায় জানান, তিনি আজ নতুন কথা বলছেন না, দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে তিনি এই আইনের পক্ষে লড়াই করছেন। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য—”যে কোনো সভ্য দেশে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড থাকা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত—এই তিনটি দেশেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি লাগু হওয়া উচিত। সবার জন্য সমান আইন দরকার। কারণ ধর্মীয় গোঁড়ামির কারণে নারীরা চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন, যার সিংহভাগই এই আইনের মাধ্যমে উপড়ে ফেলা সম্ভব।”
নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সামনে বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন লেখিকা। ইউনুস সরকারের আমলে বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন—”বাংলাদেশে হিন্দু মেয়েদের কোনো মৌলিক অধিকার নেই। তারা বাবার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হয়, এমনকি তাদের বিবাহবিচ্ছেদের আইনি অধিকারটুকুও নেই। যদি নারীদের প্রকৃত স্বাধীনতা দিতে হয়, তবে ধর্মীয় বেড়াজাল ভেঙে অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আনতেই হবে।” এর পাশাপাশি জামায়াত-ই-ইসলামির উত্থান এবং শরিয়া আইনের কালো মেঘ নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এক অন্ধকার যুগের দিকে এগোচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে এক বেনজির মন্তব্য করেন তসলিমা নাসরিন। তিনি দাবি করেন, বহু ক্ষেত্রে মাদ্রাসার মাধ্যমে কট্টরপন্থা ও জিহাদি তৈরি করা হচ্ছে। ধর্মীয় গোঁড়ামি রুখতে এই ধরণের প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে সেগুলিকে ধর্মনিরপেক্ষ আধুনিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরের আহ্বান জানান তিনি। এই প্রসঙ্গে তিনি পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যর ২০০২ সালের একটি বিতর্কিত মন্তব্য—”কিছু অননুমোদিত মাদ্রাসা উগ্রপন্থী কার্যকলাপের আখড়া হয়ে উঠছে”—তাকে প্রকারান্তরে সমর্থন জানান।
তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজ্য রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। ২০০৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে তাঁর ‘দ্বিখণ্ডিত’ উপন্যাস নিয়ে তৈরি চরম বিতর্কের জেরে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। এরপর তৃণমূলের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনেও তিনি কলকাতায় ফেরার অনুমতি পাননি। কিন্তু রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ‘সেক্যুলার মিশন’ নামক একটি সংগঠনের আমন্ত্রণে এবং রাজ্য সরকারের পূর্ণ নিরাপত্তা বেষ্টনীতে দীর্ঘ ১৯ বছর পর কলকাতায় ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন ঘটল তাঁর। ১ আগস্ট রবীন্দ্র সদনে তাঁকে এক নাগরিক সংবর্ধনাও দেওয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে তসলিমা নাসরিন স্পষ্ট করে দেন, তাঁর এই লড়াই কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়, এটি মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নারী অধিকারের এক নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম।
