প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-ঠিক এক মাস। হ্যাঁ, ঘড়ির কাঁটা ধরে মাত্র তিরিশটা দিন। আর তার মধ্যেই বাংলায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল একদা অপরাজেয় দাবি করা তৃণমূল কংগ্রেস! অহংকার, ঔদ্ধত্য আর সিন্ডিকেট রাজের অবসান ঘটিয়ে বাংলার মানুষ যখন নবান্নে নতুন বিজেপি সরকারকে বসিয়েছে, তার ঠিক এক মাসের মাথাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল— জোড়াফুল শিবিরের এই নেতাদের আদর্শ আসলে দেশসেবা ছিল না, ছিল স্রেফ ক্ষমতার মধু চাটা! আজ সেই ক্ষমতা হাতছাড়া হতেই দলটির অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র কামড়াকামড়ি। বিদ্রোহীদের ডানা ছাঁটতে এবং নিজেদের মুখরক্ষা করতে আজ চরম দেউলিয়া ও বেনজির সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক লহমায় বিলুপ্ত করে দেওয়া হলো তৃণমূলের মূল সাংগঠনিক কমিটি সহ যুব, ছাত্র (TMCP) এবং মহিলা— সমস্ত শাখা সংগঠন। যাকে বলে, ‘এক ঝটকায় সব সাফ’।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, হঠাৎ মাঝদরিয়ায় এভাবে নিজেদের ঘর নিজেদেরই ভেঙে দেওয়ার এই মরিয়া তাড়াহুড়ো কেন? আসলে রাজনৈতিক অলিন্দে কান পাতলে যে বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে, তা অত্যন্ত চমকপ্রদ। বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই দলের অন্দরে বিদ্রোহের সলতে পাকানো সম্পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। সূত্রের খবর, তৃণমূলের প্রায় ৬০ জনেরও বেশি বিধায়ক শীর্ষ নেতৃত্বের নির্দেশকে কাঁচকলা দেখিয়ে সমান্তরাল লাইনে হাঁটার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছিলেন। বিধানসভার স্পিকারের দরজায় কড়া নেড়ে নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ দাবি করার যে ‘মহারাষ্ট্র মডেল’ বাংলায় বাস্তবায়িত হওয়ার গোপন ব্লু-প্রিন্ট তৈরি হয়েছিল, তা রুখতেই এই মরণকামড় দিল কালীঘাট। বিজেপি বারবারই বলত, এই দলটা কোনো আদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে নেই, এটা স্রেফ দুর্নীতির বালির বাঁধ। আজ নিজেদের সমস্ত কমিটি রাতারাতি ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে সেই চরম সত্যেই সিলমোহর দিল ক্ষয়ে যাওয়া এই দল। বিদ্রোহীরা যাতে কোনো সংগঠিত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিধায়ক দল ভাঙতে না পারে, তাই প্ল্যাটফর্মটাই কেড়ে নিল হাইকম্যান্ড। কিন্তু প্রশ্ন হলো, খাঁচা ভেঙে কি আর পাখি আটকে রাখা যায়?
তৃণমূলের পক্ষ থেকে তাদের অফিশিয়াল এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডলে সাফাই দেওয়া হয়েছে, ‘কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নতুন কমিটি হবে’। এই হাস্যকর যুক্তি শুনে এখন হাসছে গোটা বাংলার ওয়াকিবহাল মহল। যে দলের আপাদমস্তক নীতি, কুশাসন আর দুর্নীতিকেই রাজ্যের মানুষ বুথস্তরে প্রত্যাখ্যান করেছে, সেখানে নিচুতলার চুনোপুঁটি কর্মীদের কিসের মূল্যায়ন? পরাজয় তো কোনো একজন বুথ সভাপতি বা ব্লকের নয়, পরাজয় হয়েছে বিগত দেড় দশকের অপশাসনের। যুব বা ছাত্র পরিষদ— যারা এতদিন বুথস্তরে ক্ষমতার দম্ভে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করত, আজ ক্ষমতার মধুভাণ্ড ছিটকে যেতেই তারা দিশেহারা। আর তাদের এক লহমায় বাতিল করে দেওয়া আসলে শীর্ষ নেতৃত্বের চরম অসহায়তা আর সাংগঠনিক দেউলিয়াপনারই স্পষ্ট ইশতেহার।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার এই একনায়কতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হতে চলেছে। কমিটি ভেঙে দিয়ে বিদ্রোহীদের সাময়িকভাবে পদহীন করা গেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের ভেতরের ক্ষোভের আগুনকে নেভানো যায়নি। বরং যাদের ডানা ছাঁটা হলো, ক্ষমতার অলিন্দ থেকে ছিটকে যাওয়া সেই রাঘববোয়ালরা এবার ক্ষোভে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তৃণমূলের এই ‘অল ক্লিয়ার’ স্ট্র্যাটেজি ডুবন্ত যৌথ খামারকে বাঁচাবে, নাকি অভ্যন্তরীণ ভাঙনের গতিকে আরও দশ গুণ বাড়িয়ে দিয়ে দলটিকে ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে পাঠিয়ে দেবে, তা স্রেফ সময়ের অপেক্ষা। তবে একটা বিষয় পরিষ্কার— মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সুশাসনের জমানায় প্রাক্তন শাসকদলের রাজনৈতিক অস্তিত্ব এখন সাইন বোর্ডের পর্যায়ে পৌঁছানোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। নজর থাকবে পরবর্তী খবরের দিকে।
