প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিং ও ভাঙড় রাজনীতিতে ফের একবার তোলপাড়। মার্চ মাসের সেই চাঞ্চল্যকর ভাঙড় বিস্ফোরণ মামলার তদন্তে আজ সাতসকালেই প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক সওকত মোল্লার জীবনতলার বাড়ি ও কার্যালয়ে হানা দিয়েছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (NIA)। আর রাজ্যের এই হাইভোল্টেজ এনআইএ অভিযানের আবহেই তীব্র রাজনৈতিক আক্রমণ শানালেন রাজ্যের পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। নিজের চেনা মেজাজে তোপ দেগে তিনি দাবি করেছেন, সওকত মোল্লা অনেক পাপের ভাগীদার, আর এবার কেন্দ্রীয় সংস্থার জালে আটকালে তাঁর রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ।
সাতসকালে যখন সাধারণ মানুষ ঘুম থেকে উঠছে, ঠিক তখনই কেন্দ্রীয় বাহিনীর ঘেরাটোপে মুড়ে ফেলা হলো সওকত মোল্লার বাড়ি। মার্চ মাসে ভাঙড়ে যে ভয়াবহ বোমা বিস্ফোরণ ঘটেছিল, যাতে প্রাণ হারিয়েছিলেন একজন এবং জখম হয়েছিলেন আরও তিনজন, সেই ঘটনারই সূত্র ধরে এই এনআইএ অভিযান। তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, গত বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এলাকায় বিপুল পরিমাণ বারুদ ও বোমা মজুত করা হয়েছিল এবং সেই মজুত বোমা থেকেই ঘটেছিল ওই মারাত্মক দুর্ঘটনা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলায় এই বোমাবাজির সংস্কৃতির শেষ কোথায়? প্রাক্তন শাসকদলের একাংশের মদতে যে বারুদের স্তূপ তৈরি হয়েছিল বলে বারেবারে অভিযোগ উঠত, তার শেষ পরিণতি কি এবার মিলবে? এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্যের নতুন ক্যাবিনেট মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বিন্দুমাত্র রেয়াত করেননি প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ককে। নিজের চিরপরিচিত আক্রমণাত্মক মেজাজে তিনি বলেন, “সওকত মোল্লা অনেক পাপের ভাগীদার। ভাঙড়-ক্যানিং এলাকায় বছরের পর বছর ধরে যে হিংসা, যে দুর্নীতি আর বোমাবাজির রাজনীতি চলেছে, তা আর কারও অজানা নয়। আইন সবার জন্য সমান। এই পাপের বিচার হবেই। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা একবার যদি ভেতরে ঢোকায়, তবে ওঁর আর সহজে বেরোনোর কোনো সম্ভাবনা নেই।”
বিষয়টি কেবল বোমাবাজিতেই সীমাবদ্ধ নয়, দিলীপ ঘোষের এই মন্তব্যের নেপথ্যে রয়েছে এক নতুন বিতর্ক। ক্যানিং এলাকায় সওকত মোল্লা ঘনিষ্ঠ এক প্রাক্তন তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, সোনার গয়না এবং চুরির টাকা আত্মসাৎ করে তা লুকিয়ে রাখার জন্য সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার (OT) ব্যবহার করা হয়েছে! এই ঘটনা সামনে আসতেই সরব হয়েছে বিজেপি নেতৃত্ব। দিলীপ ঘোষের স্পষ্ট তোপ, সরকারি হাসপাতাল যেখানে গরিব মানুষের চিকিৎসা হওয়ার কথা, সেখানে চলত প্রাক্তন শাসকদলের একদল নেতার চুরির মাল লুকানোর খেলা! বাংলায় পরিবর্তনের পর সেইসব অভিযোগের ফাইল এবার এক এক করে খুলতে শুরু করেছে বলে দাবি পদ্ম শিবিরের।
রাজ্যের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এখন সম্পূর্ণ আলাদা। বিগত ১৫ বছরের তৃণমূল জমানার অবসান ঘটিয়ে বাংলায় এখন ডবল ইঞ্জিন সরকার। আর তাই রাজ্যের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে বলতে গিয়ে মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ মনে করিয়ে দেন যে, অতীতে পুলিশ প্রশাসনকে যেভাবে অথর্ব ও নিকম্মা করে রাখা হয়েছিল, সেই দিন এখন অতীত। আজ যখন কেন্দ্রীয় সংস্থা তদন্তে নামছে, তখন প্রাক্তন শাসকদলের নেতারা ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলছেন আর নাটক করছেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আর এই নাটকে ভুলছেন না। সন্ত্রাস, তোলাবাজি আর বোমা-গুলির এই অপসংস্কৃতিকে উপড়ে ফেলতে নতুন সরকার যে জিরো টলারেন্স নীতি নিয়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন তিনি।
একদা ভাঙড়ের বেতাজ বাদশা হিসেবে পরিচিত সওকত মোল্লার বাড়িতে যখন এনআইএ তল্লাশি চালাচ্ছে, তখন সওকত নিজে কিন্তু বেপাত্তা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজরদারিতে ওঁর ছেলের সাথে কথা বলছেন আধিকারিকরা। রাজনৈতিক মহলের মতে, মন্ত্রী দিলীপ ঘোষের এই আক্রমণ কেবল একটি সাধারণ রাজনৈতিক খোঁচা নয়, এটি আসলে দুর্নীতিগ্রস্ত ও হিংসাশ্রয়ী রাজনীতির বিরুদ্ধে নতুন সরকারের এক চরম হুঁশিয়ারি। এখন দেখার, এই বারুদের গন্ধ আর ওটি-র সোনা উদ্ধারের জল শেষ পর্যন্ত কতদূর গড়ায়।
