প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নাম এবং তাদের সংরক্ষিত ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI) কর্তৃক সাময়িকভাবে ফ্রিজ (স্থগিত) করার পর, বাংলার রাজনীতির জল এবার গড়াল দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল আইনি লড়াইয়ের দিকে। গত ১৭ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশন যে অন্তর্বর্তী আদেশ জারি করেছে, তা মূলত আগামী ৬ অক্টোবর ২০২৬-এর নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর উপনির্বাচনের ভোটারদের বিভ্রান্তি এড়ানোর একটি সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। আসল আইনি যুদ্ধটি লড়া হবে ‘ইলেকশন সিম্বলস (রিজার্ভেশন অ্যান্ড অ্যালটমেন্ট) অর্ডার, ১৯৬৮’-এর ঐতিহাসিক ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদ (Paragraph 15)-এর অধীনে, যার চূড়ান্ত রায়ের ওপর নির্ভর করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিদ্রোহী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের ভবিষ্যৎ।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, যখন কোনও স্বীকৃত রাজনৈতিক দলের অন্দরে দুটি গোষ্ঠী নিজেদের ‘আসল দল’ বলে দাবি করে এবং প্রতীক নিয়ে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়, তখন কমিশন ‘প্যারাগ্রাফ ১৫’ প্রয়োগ করে। এই ধারার অধীনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আইনি ধাপগুলি অত্যন্ত দীর্ঘ ও জটিল। দুই শিবিরকেই তাদের পক্ষে থাকা দলের সদস্য, জেলা সভাপতি, ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য এবং নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের (MLA ও MP) স্বাক্ষর সংবলিত হলফনামা বা অ্যাফিডেভিট কমিশনের কাছে জমা দিতে হবে। নির্বাচন কমিশনের লিগ্যাল উইং (Legal Wing) প্রতিটি হলফনামার সত্যতা এবং স্বাক্ষরগুলি আসল কিনা, তা যুদ্ধকালীন তৎপরতায় স্ক্রুটিনি বা পরীক্ষা করে দেখে। উভয় পক্ষের দেশের শীর্ষ সারির আইনজীবীরা নির্বাচন কমিশনের ফুল-বেঞ্চের সামনে জীবনের সব যুক্তি সাজিয়ে দিনের পর দিন সওয়াল-জবাব চালাবেন।
আইনি ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্যারাগ্রাফ ১৫-এর অধীনে চলা এই তদন্ত ও শুনানি প্রক্রিয়া অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ। অতীতে সমাজবাদী পার্টি, এআইএডিএমকে (AIADMK) কিংবা মহারাষ্ট্রের শিবসেনা ও এনসিপি (NCP) মামলার ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত রায়ে পৌঁছাতে কমপক্ষে ৫ থেকে ৮ মাস, এমনকি এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তার মানে, আজ ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ (শুক্রবার) সকাল ১১টার ডেডলাইনের মধ্যে দুই শিবির যে নতুন অন্তর্বর্তী নাম ও মুক্ত প্রতীক (Free Symbols) জমা দিয়েছে, তা কেবল ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনেই সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আগামী দিনে রাজ্যে কোনও পুরভোট বা অন্য কোনও নির্বাচন হলে, চূড়ান্ত রায় না আসা পর্যন্ত দুই পক্ষকেই এই নতুন অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক নিয়েই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
সুপ্রিম কোর্টের পুরোনো নজির অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন চূড়ান্ত রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে আবেগ বা দলের প্রতিষ্ঠাতা কে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয় ‘টেস্ট অফ মেজরিটি’ (Test of Majority) বা সংখ্যার জোরের ওপর। বিদ্রোহী অরূপ রায় ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের পক্ষে ইতিমধ্যেই দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জন বিধায়ক সই দিয়েছেন, যা দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করে। যদি দীর্ঘমেয়াদি শুনানিতেও বিদ্রোহী শিবির আইনসভা এবং সাংগঠনিক সংস্থায় এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখতে পারে, তবে আইনগতভাবে ‘জোড়া ঘাসফুল’ প্রতীক এবং মূল দলের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতেই যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর তা যদি হয়, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সম্পূর্ণ নতুন দল নিবন্ধীকরণ (Registration) করে নতুন করে পথ চলতে হবে। ফলে ‘প্যারা-১৫’-এর এই আইনি লড়াই আসলে বাংলার রাজনীতির দীর্ঘমেয়াদি চরিত্র বদলে দেওয়ার এক অমোঘ হাতিয়ার।
