প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
বিধানসভা নির্বাচনের রণদামামা বাজার পর থেকেই বাংলার পুলিশ ও প্রশাসনিক মহলে স্বচ্ছতা ফেরাতে কোমর বেঁধে নেমেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। আর কমিশনের সেই ‘অপারেশন ক্লিন’-এ বাধা দিতে গিয়েই বড়সড় আইনি চপেটাঘাত খেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। আইএএস (IAS) ও আইপিএস (IPS) অফিসারদের বদলিতে স্থগিতাদেশ চেয়ে দায়ের করা জোড়া জনস্বার্থ মামলা সপাটে খারিজ করে দিল কলকাতা হাইকোর্ট। মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল এবং বিচারপতি পার্থসারথি সেনের ডিভিশন বেঞ্চ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, “অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের স্বার্থে কোন পরিস্থিতিতে এবং কেন অফিসারদের সরানো হচ্ছে, তার কৈফিয়ত দিতে নির্বাচন কমিশন বাধ্য নয়।” আদালতের এই পর্যবেক্ষণে নবান্নের ‘প্রিয়’ আধিকারিকদের আগলে রাখার শেষ চেষ্টাও কার্যত বিফলে গেল।
কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পরেই আইপিএস-সহ একাধিক জেলাশাসক ও পুলিশ সুপারকে সরিয়ে দিয়েছিল। এর পরেই নবান্ন-ঘনিষ্ঠ মহলে শোরগোল পড়ে যায়। জনস্বার্থ মামলার মোড়কে আদালতে দাবি করা হয়েছিল যে, গত ১৫ থেকে ১৯ মার্চের মধ্যে অন্তত ৪৬ জন উচ্চপদস্থ আধিকারিককে বদল করা হয়েছে। এরপর বিডিও (BDO), আইসি (IC) এবং ওসি (OC)-দেরও সমানে বদলি করছে কমিশন। মামলাকারীর যুক্তি ছিল, এভাবে ঢালাও বদলি করলে নাকি প্রশাসনিক কাজে এবং আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে “অত্যন্ত অসুবিধা” হবে। কিন্তু রাজনৈতিক মহলের দাবি, আদতে নিজেদের আস্থাভাজন আধিকারিকদের সরিয়ে দেওয়ায় ভোট পরিচালনার রাশ আলগা হওয়ার ভয়েই এই আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নেওয়া হয়েছিল।
এদিন মামলা খারিজ করার পাশাপাশি আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে, তা রাজ্য সরকারের জন্য অত্যন্ত অস্বস্তিকর। আদালত সাফ জানায়, জনস্বার্থ বিঘ্নিত না হলে এই বদলি নিয়ে কোনো আইনজীবীর ব্যক্তিগতভাবে অভিযোগ করার কোনো আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না। সংবিধানের ৩২৪ ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সংস্থা। অবাধ ভোট নিশ্চিত করতে তারা কাদের বদলি করবে, তা সম্পূর্ণ তাদের এক্তিয়ারভুক্ত। আদালত এতে হস্তক্ষেপ করবে না। এত বিপুল সংখ্যক অফিসার বদলিতে আইনশৃঙ্খলার অবনতি হবে— মামলাকারীর এই দাবিকে হেসেই উড়িয়ে দিয়েছে আদালত। জনগণের কোনো ক্ষতি হওয়ার বিন্দুমাত্র প্রমাণ মেলেনি বলে জানায় বেঞ্চ।
হাইকোর্টের এই রায়ের পরেই উল্লাসে ফেটে পড়েছে বিজেপি শিবির। রাজ্য বিজেপি নেতৃত্বের দাবি, “মুখ্যমন্ত্রী চেয়েছিলেন তাঁর অনুগত ও ‘ক্যাডার’ হিসেবে পরিচিত পুলিশ অফিসারদের দিয়ে বুথ দখল করতে এবং বিরোধীদের ভয় দেখাতে। কিন্তু কমিশন ও আদালত মিলে সেই অশুভ আঁতাত ভেঙে দিয়েছে।” বিজেপি নেতা শমীক ভট্টাচার্য আগেই সরব হয়েছিলেন যে, বাংলার বহু আধিকারিক সরকারি বেতন নিলেও আদতে শাসক দলের হয়ে কাজ করেন। আদালতের এই রায় সেই অভিযোগেই সিলমোহর দিল বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
এই রায়ের ফলে প্রশাসনিক স্তরে তৃণমূলের যে ‘নিরাপদ গড়’ ছিল, তা বড়সড় ভাঙনের মুখে পড়ল। এর আগে জেলায় জেলায় এমনকি প্রশাসনিক শীর্ষস্তর পর্যন্ত অনেক আধিকারিককে সরিয়ে দিয়েছে কমিশন। এবার হাইকোর্টের এই রায়ের পর কমিশন আরও বড় পদক্ষেপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে স্পর্শকাতর জেলাগুলোতে যেখানে শাসক দলের নেতাদের সঙ্গে পুলিশ কর্তাদের ‘সুসম্পর্ক’ নিয়ে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে আরও বড় কোপ পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কলকাতা হাইকোর্টের এই রায় আসলে কমিশনের হাতকে আরও শক্ত করল। প্রশাসনিক মহলের মতে, নবান্ন এখন সুপ্রিম কোর্টে যাওয়ার কথা ভাবলেও, হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণের পর সেখানেও বড় কোনো স্বস্তি পাওয়ার আশা ক্ষীণ। মোটের ওপর, ২০২৬ এর ভোটের আগে প্রশাসনিক রাশ এখন পুরোপুরি কমিশনের হাতে, আর সেখানেই সিঁদুরে মেঘ দেখছে শাসক দল।
