প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-
পশ্চিমবঙ্গে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আরও একবার কড়া দাওয়াই প্রয়োগ করল ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। এবার কমিশনের কোপে পড়লেন পূর্ব মেদিনীপুরের জেলাশাসক (DM) তথা জেলা নির্বাচনী আধিকারিক (DEO) ইউনিল ঋষিন ইসমাইল (Unice Rishin Ismail)। ভোটকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুতর অনিয়ম এবং কমিশনের নির্দেশিকা লঙ্ঘনের অভিযোগে তাঁকে অবিলম্বে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর পরিবর্তে নতুন জেলাশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অভিজ্ঞ আইএএস (IAS) অফিসার নিরঞ্জন কুমারকে (Niranjan Kumar)।
নির্বাচন কমিশনের স্পষ্ট গাইডলাইন রয়েছে যে, নির্বাচনের কাজে বা পোলিং পার্সোনেল ডেটাবেজে কোনোভাবেই অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের (Contractual Employees) নাম নথিভুক্ত করা যাবে না। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারি স্থায়ী কর্মচারী, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সংস্থার স্থায়ী কর্মীরাই এই কাজের জন্য যোগ্য। কিন্তু অভিযোগ ওঠে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভোটকর্মীদের যে তথ্যভাণ্ডার বা ডেটাবেজ তৈরি করা হয়েছে, তাতে নিয়ম ভেঙে কয়েক হাজার চুক্তিভিত্তিক কর্মীর নাম ঢোকানো হয়েছে।
সূত্রের খবর, এই ‘কারচুপি’র খবর কমিশনের কানে পৌঁছাতেই তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে কমিশন মনে করছে, এটি একটি “গুরুতর গাফিলতি” (Serious Lapse)। চুক্তিভিত্তিক কর্মীদের ভোটের ডিউটিতে লাগানোর এই চেষ্টা সরাসরি নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে কলুষিত করতে পারে বলে মনে করছে কমিশন। এর পরেই তড়িঘড়ি জেলাশাসককে সরানোর নির্দেশ জারি করা হয়।
শুধু জেলাশাসককে সরানোই নয়, রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে (CEO) এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। আগামী তিন দিনের মধ্যে বিস্তারিত রিপোর্ট তলব করা হয়েছে। কারা এই অবৈধভাবে নাম ঢোকানোর নেপথ্যে রয়েছেন, কার নির্দেশে সরকারি নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানো হলো এবং জেলা প্রশাসনের তথ্য যাচাইকরণে কোথায় ফাঁক ছিল—তা বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কমিশন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণার পর থেকেই বাংলাজুড়ে প্রশাসনিক ও পুলিশি কাঠামোয় ব্যাপক রদবদল চালাচ্ছে কমিশন। পূর্ব মেদিনীপুরের এই ঘটনা সেই ধারাবাহিক অভিযানেরই অংশ। নিরপেক্ষ ভোট করানোর লক্ষ্যে এ পর্যন্ত একঝাঁক শীর্ষ আধিকারিককে সরানো হয়েছে: নির্বাচনের নির্ঘণ্ট ঘোষণার পরপরই বদল করা হয়েছিল তৎকালীন মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তী এবং স্বরাষ্ট্র সচিব জগদীশ প্রসাদ মিনাকে।কমিশনের নির্দেশে সরানো হয়েছে রাজ্য পুলিশের তৎকালীন ডিজি (DGP) পীযূষ পাণ্ডে এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার সুপ্রতিম সরকারকে। পূর্ব মেদিনীপুর ছাড়াও ঝাড়গ্রাম, পূর্ব বর্ধমান এবং বীরভূমের মতো গুরুত্বপূর্ণ জেলার জেলাশাসকদেরও পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কমিশন ১৯ জন সিনিয়র পুলিশ অফিসারকে বদলি করেছে। এছাড়াও সম্প্রতি ৭৩ জন রিটার্নিং অফিসারকেও (RO) বদলি করার নির্দেশ দিয়ে প্রশাসনকে কড়া বার্তা দিয়েছে কমিশন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, জেলা প্রশাসনের ওপর শাসক দলের প্রভাব খাটানোর চেষ্টার একটি বড় উদাহরণ এই ঘটনা। বিরোধীদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করা হচ্ছিল যে, চুক্তিভিত্তিক বা সিভিক কর্মীদের ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। জেলাশাসককে সরিয়ে দিয়ে কমিশন সেই আশঙ্কায় সিলমোহর দিল।
কমিশনের এই কড়া অবস্থানের ফলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রশাসনিক স্তরে এই ব্যাপক রদবদল স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার পক্ষপাত বা অনিয়ম সহ্য করা হবে না। এখন দেখার, তদন্ত রিপোর্ট জমা পড়ার পর আর কোন কোন আধিকারিক কমিশনের কোপে পড়েন।
