প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-২০২৬ সালের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজ্যে নবগঠিত ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) নতুন সরকারের প্রথম বিধানসভা অধিবেশনের শুরুতেই তৈরি হলো এক নজিরবিহীন কলঙ্কময় অধ্যায়। রাজ্যপালের ভাষণের ওপর ধন্যবাদ জ্ঞাপক আলোচনায় অংশ নিয়ে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিলেন বেলেঘাটের মমতাপন্থী তৃণমূল বিধায়ক কুণাল ঘোষ। বিধানসভা কক্ষে বক্তব্য রাখতে উঠে তিনি যেভাবে খোদ স্পিকারের চেয়ার, বিরোধী দলনেতা এবং শাসক পক্ষকে নিশানা করে অশালীন আক্রমণ চালালেন, তাতে প্রথম দিনেই রণক্ষেত্রের রূপ নিল কক্ষ। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটে হেরে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার চরম হতাশা এবং দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র গৃহযুদ্ধই প্রথম অধিবেশনে এভাবে অনভিপ্রেত ও উগ্রভাবে আছড়ে পড়ল বিধানসভার ফ্লোরে।
২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূলের অন্দরের ভাঙন ও ক্ষমতার কামড়াকামড়ি যে কতটা তীব্র, তা আজ বিধানসভার অন্দরেই প্রমাণিত হয়ে গেল। মমতা শিবিরের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বক্তব্য রাখতে উঠেই তীব্র আক্রমণ শানান সদ্য গঠিত তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ তথা ‘বিদ্রোহী’ শিবিরের নেতা এবং স্পিকারের অনুমোদিত বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে। ঋতব্রতবাবুকে ‘ব্যাকডোর’ বা পিছনের দরজা দিয়ে আসা নেতা এবং ‘মেরুদণ্ডহীন’ বলে কটাক্ষ করার পাশাপাশি বালুরঘাটের একটি পুরোনো মামলার প্রসঙ্গ তুলে অত্যন্ত ব্যক্তিগত স্তরের কাদা ছোঁড়াছুড়ি শুরু করেন কুণাল ঘোষ। ভোটে হেরে যাওয়ার পর একসময়ের সতীর্থদের যেভাবে কুণাল ঘোষ আক্রমণ করলেন, তাতে বিধানসভার গণতান্ত্রিক পরিবেশ সম্পূর্ণ কলঙ্কিত হয়।
কুণাল ঘোষ বক্তব্য রাখতে শুরু করা মাত্রই বিধানসভার ট্রেজারি বেঞ্চে থাকা নতুন শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) বিধায়করা তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়েন। কুণাল ঘোষের অতীত এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গ টেনে বিজেপি বিধায়করা সমস্বরে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। এই গণ-প্রতিবাদের মুখে মেজাজ হারিয়ে পাল্টা উদ্ধত আচরণ শুরু করেন বেলেঘাটার বিধায়ক। তিনি বিজেপি বিধায়কদের উদ্দেশ্যে চেঁচিয়ে বলতে থাকেন, “আপনারা আমাকে ভয় পান বলেই বলতে দিতে চাইছেন না। আগামী ৫ বছর আমার এই ভয় নিয়েই আপনাদের চলতে হবে”। এমনকি বিজেপি বিধায়কদের পুরোনো মন্তব্য টেনেও তিনি ব্যক্তিগত আক্রমণ শানাতে পিছপা হননি।
সভার পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে নবনিযুক্ত স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসু কুণাল ঘোষকে সংযত হওয়ার নির্দেশ দেন এবং অবান্তর কথা বলতে বারণ করেন। কিন্তু সৌজন্যের সব সীমা লঙ্ঘন করে কুণাল ঘোষ সরাসরি স্পিকারের চেয়ারকেও আক্রমণ করে বসেন। স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি সপাট বলেন, “আপনি স্পিকারের আসনে বসে আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলবেন না। মনে রাখবেন, আপনিও কিন্তু প্রথমবারই এখানে স্পিকার হয়ে এসেছেন। আর আপনি যদি আমার সঙ্গে এইভাবে কথা বলেন, তবে আমি কি আপনাকে রসগোল্লা খাওয়াব নাকি?” একজন বিধায়কের মুখে স্পিকারের প্রতি এমন অবমাননাকর ও অভদ্র ভাষা শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায় গোটা সংসদীয় ক্ষেত্র। পরবর্তীতে পরিস্থিতি সামলাতে কুণাল ঘোষের এই আপত্তিকর উক্তিগুলি কার্যবিবরণী থেকে বাদ (Expunged) দিতে বাধ্য হন স্পিকার।
বিজেপি শিবিরের বিধায়কদের মতে, ২০২৬ সালের ঐতিহাসিক গণরায় এবং ক্ষমতা হাতছাড়া হওয়া কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মমতাপন্থী তৃণমূল নেতৃত্ব। সেই পরাজয়ের গ্লানি ও চরম হতাশা থেকেই বিধানসভার প্রথম অধিবেশনে এমন মারমুখী ও অগণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করছেন কুণাল ঘোষের মতো নেতারা। সংসদীয় রীতিনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যেভাবে প্রথম অধিবেশনকেই কলঙ্কিত করা হলো, তার তীব্র নিন্দা করছে বাংলার ওয়াকিবহাল মহল। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত পরিষদীয় মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষকে হস্তক্ষেপ করতে হয় এবং তিনি সকলকে সংসদীয় সৌজন্যতা বজায় রেখে রাজ্যপালের ভাষণের মূল আলোচনায় ফেরার অনুরোধ জানান।
