প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-মে মাসের তপ্ত দুপুরে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় এক চরম রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী থাকল রাজ্য রাজনীতি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে একদিকে যেমন বিধানসভা পেল তার নতুন অভিভাবককে, তেমনই অন্যদিকে এক মস্ত বড় সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। আজ, শুক্রবার রাজ্য রাজনীতিতে ঘটে গেল দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা— প্রথমত, উত্তরবঙ্গের ভূমিপুত্র তথা বিজেপির হেভিওয়েট নেতা রথীন্দ্রনাথ বসু সর্বসম্মতভাবে বিধানসভার নতুন স্পিকার (অধ্যক্ষ) নির্বাচিত হলেন; আর তার ঠিক পরপরই নতুন স্পিকারের কক্ষে গিয়ে নন্দীগ্রামের বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
বিধানসভার ইতিহাসে এই প্রথম উত্তরবঙ্গের কোনো জনপ্রতিনিধি স্পিকার পদে আসীন হলেন। পেশায় চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং কোচবিহার দক্ষিণের বিধায়ক রথীন্দ্রনাথ বসু আজ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় স্পিকার নির্বাচিত হয়েছেন। আজ বিধানসভা কক্ষে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই স্পিকার হিসেবে রথীন্দ্রবাবুর নাম প্রস্তাব করেন। প্রোটেম স্পিকার তাপস রায় ধ্বনিভোটের মাধ্যমে তাঁকে নির্বাচিত ঘোষণা করার পর মুখ্যমন্ত্রী এবং বিরোধী দলনেতা যৌথভাবে নতুন স্পিকারকে তাঁর আসনে বসান। রথীন্দ্রনাথ বসু স্পিকারের চেয়ারে বসার পরেই মুখ্যমন্ত্রী তাঁর কক্ষে যান এবং বিধায়ক পদের আইনি বাধ্যবাধকতা মেনে নন্দীগ্রাম আসন থেকে নিজের পদত্যাগপত্র আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেন। স্পিকার সেই ইস্তফাপত্র গ্রহণ করেছেন।
রাজনৈতিক মহলে এই পদত্যাগ নিয়ে জল্পনা তৈরি হলেও, এর পেছনে রয়েছে সম্পূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক কারণ। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির বিপুল জয়ের পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই দুটি হাই-প্রোফাইল আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন— নিজের ঘরের মাঠ নন্দীগ্রাম এবং কলকাতার ভবানীপুর। জনগণের আশীর্বাদে তিনি উভয় আসন থেকেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। কিন্তু ভারতীয় সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি একসঙ্গে দুটি আসনের বিধায়ক থাকতে পারেন না। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের ১৪ দিনের মধ্যে যে কোনো একটি আসন ছেড়ে দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকে। সেই নিয়ম মেনেই, গত বুধবার তিনি ভবানীপুরের বিধায়ক হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন এবং আজ অত্যন্ত মার্জিতভাবে নন্দীগ্রাম আসনটি ত্যাগ করলেন।
পদত্যাগের পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, বিধায়ক পদ ছাড়লেও নন্দীগ্রামের মাটির সঙ্গে তাঁর নাড়ির টান চিরকাল থাকবে। তাঁর কথায়, “নন্দীগ্রাম আমার রাজনৈতিক পুনর্জন্মের মাটি। বিধায়ক পদ থেকে ইস্তফা দেওয়াটা কেবলই একটি আইনি প্রক্রিয়া। নন্দীগ্রামের মানুষের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা এক চুলও কমবে না। আগামী ৫ বছর সেখানকার প্রতিটা বুথের উন্নয়নমূলক কাজ আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করব।”
মুখ্যমন্ত্রীর এই ইস্তফার ফলে নন্দীগ্রাম বিধানসভা আসনটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে শূন্য ঘোষিত হলো এবং সেখানে আগামী দিনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবানীপুর আসনটি নিজের কাছে রেখে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দিলেন যে, তিনি কলকাতার রাজপথ থেকে শুরু করে গোটা রাজ্যের প্রশাসনিক রাশ শক্ত হাতে পরিচালনা করতে প্রস্তুত। পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের রথীন্দ্রনাথ বসুকে স্পিকার করে দল আঞ্চলিক ভারসাম্যের এক দারুণ নজির গড়ল।
