প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-কুর্সি গেছে। ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচন শাসকদলকে ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে। নবান্ন এখন অতীত। কিন্তু ক্ষমতা চলে গেলেও ক্ষমতার অলিন্দে যে লড়াই, তা কি থামে? থমকায়? না মশাই, থামে না। বরং জোড়াফুলের অন্দরে এখন যে গৃহযুদ্ধ চলছে, তা দেখে রোমান সম্রাট নিরোর সেই চেনা ট্র্যাজেডির কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। তফাত শুধু একটাই—সেখানে রোম জ্বলছিল, আর এখানে জ্বলছে ঘাসফুলের সাজানো বাগান। চতুর্দিক থেকে আওয়াজ উঠছে—‘অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাতে হবে, অভিষেক নিষ্ক্রিয় হোক’। প্রবীণরা আঙুল তুলছেন দলের এই ঐতিহাসিক পরাজয়ের পর। নবীনরা দিশেহারা। বিক্ষুব্ধরা তো একধাপ এগিয়ে ‘নতুন তৃণমূল’ নামে আলাদা ব্লক তৈরি করে ফেলেছে এবং বিধানসভায় বেছে নেওয়া হয়েছে আলাদা বিরোধী দলনেতাও। অর্থাৎ, দলের কোমরটা কার্যত ভেঙে দু-টুকরো। তাও… তাও কেন দলনেত্রী নড়চড় করছেন না? কেন এখনও পিসির চোখে শুধুই ভাইপো? কেন এই অন্ধমোহ? আজকের প্রতিবেদনে আমরা এর ভেতরের আসল সত্যকে এক্কেবারে খোলসা করব।
প্রথম কারণটা খুব খাস, একেবারে ঘরোয়া। একে রাজনীতির ভাষায় বলে ‘ডায়নাস্টি সিনড্রোম’ বা পরিবারতন্ত্রের মায়াজাল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর জীবনের রক্ত-জল করা পরিশ্রমে এই দলটা গড়েছিলেন। আজ দল ক্ষমতাচ্যুত। এই কঠিন সময়ে তিনি যদি অভিষেককে সরিয়ে দেন, তবে দলের রাশ চলে যাবে অন্য শিবিরের হাতে। মমতা খুব ভালো করেই জানেন, দলের ব্যাটন একবার পরিবারের বাইরে গেলে, সেই ব্যাটন আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তাই চারদিকে বিদ্রোহের আগুন জ্বললেও, পিসি তাঁর সাধের রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের চাবিকাঠি ভাইপোর হাতেই সুরক্ষিত দেখতে চান। দল গোল্লায় যাক, কিন্তু ব্যাটন যেন হাতছাড়া না হয়! দ্বিতীয় কারণটা আরও টাটকা। রাজনীতিতে একটা প্রবাদ আছে—‘আঘাত পেলেই নাকি সহানুভূতি বাড়ে’। সম্প্রতি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সোনারপুরে ভোট-পরবর্তী হিংসার শিকার মানুষদের ক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে লক্ষ্য করে ডিম ছোঁড়া হলো, পাথর ছোঁড়া হলো। রীতিমতো আক্রান্ত হলেন তিনি। দলনেত্রী কিন্তু এই বিপর্যয়কেও রাজনৈতিক অস্ত্র বানাতে ছাড়েননি। তিনি স্বয়ং ময়দানে নেমে বললেন, ‘অভিষেককে পরিকল্পিতভাবে খুন করার চেষ্টা হচ্ছে, তাঁর চিকিৎসা করতে দেওয়া হচ্ছে না’। খুব চেনা চাল, তাই না? যখনই দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যায়, তখনই ‘ভিকটিম কার্ড’ খেলো। মমতা ভাবছেন, এই আক্রমণের ঘটনাকে পুঁজি করে যদি কর্মীদের মনে আবেগ জাগিয়ে তোলা যায়। এই মোক্ষম সময়ে অভিষেককে সরিয়ে দিলে তো কার্যত বিরোধীদের এবং দলের ভেতরের বিদ্রোহীদের জয় স্বীকার করে নেওয়া হবে। তাই পিসি এখন ভাইপোকে ‘শহিদ’ প্রমাণের মরিয়া চেষ্টায় ব্যস্ত।
তৃতীয় কারণটা? সেটা হলো ‘সংগঠন এবং এজেন্সির ভয়’। বিগত কয়েক বছর ধরে দলের আইটি সেল, অর্থ ভাণ্ডার এবং যুব সংগঠনকে নিজের মতো করে সাজিয়েছেন অভিষেক। এই মুহূর্তে তাঁকে ছেঁটে ফেললে পুরো সাংগঠনিক তাসের ঘরটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে। তার ওপর রয়েছে কেন্দ্রীয় এজেন্সির তরফ থেকে আইনি খাঁড়া। দলের পদ চলে যাওয়া মানেই কিন্তু রাজনৈতিক রক্ষাকবচ চলে যাওয়া। অভিষেক নিষ্ক্রিয় হওয়া মানেই আইনি চাপ আরও বহু গুণ বেড়ে যাওয়া। তাই ভাইপোকে বাঁচাতেই পিসিকে নিজের অনড় অবস্থান ধরে রাখতে হচ্ছে। তাহলে সমীকরণটা কী দাঁড়াল? একদিকে দলের অস্তিত্ব, কর্মীদের ক্ষোভ, ‘নতুন তৃণমূল’ বনাম ‘পুরনো তৃণমূলের’ আড়াআড়ি ভাঙন। আর অন্যদিকে… শুধুই পরিবারের প্রতি অন্ধমোহ এবং আইনি বাধ্যবাধকতা। ক্ষমতার কুর্সি হারানোর পর এই জোড়াফুলের অন্দরের কোন্দল এখন কোন তলানিতে গিয়ে ঠেকে, সেটাই দেখার।
