Site icon প্রিয় বন্ধু মিডিয়া

‘লড়াকু’ মমতার এই পরিণতি কেন? গৃহবন্দির অভিযোগে সোচ্চার, কিন্তু রাজপথে আন্দোলনের সেই ঝাঁজ উধাও কেন?

 

 

প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতির একটা সময় ছিল যখন ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’ নামটার সঙ্গেই জড়িয়ে থাকত রাজপথের তীব্র আন্দোলন, ব্যারিকেড ভাঙার জেদ আর পুলিশের লাঠি-টিয়ার গ্যাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে লড়াই করার ছবি। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সেই অগ্নিগর্ভা বিরোধী নেত্রীকে আজ আর দেখা যাচ্ছে না। বর্তমানে রাজ্যে ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে, মসনদে রয়েছে বিজেপি সরকার। কিন্তু সাম্প্রতিককালে একের পর এক ঘটনায় নিজের কালীঘাটের বাসভবনে ‘হাউস অ্যারেস্ট’ বা পরোক্ষ গৃহবন্দি থাকার যে অভিযোগ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তুলছেন, সেখানে তাঁর আগের মতো সেই তীব্র প্রতিরোধ বা রাজপথ কাঁপানো সংগ্রাম উধাও কেন? কেন তিনি এত হতাশ ও আছড়ে পড়ছেন? বাংলার রাজনৈতিক মহলে এখন এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

সম্প্রতি বরুইপুরের একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কিংবা নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আবহে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার অভিযোগ করেছেন যে, পুলিশ প্রশাসন তাঁর বাড়ির বাইরে ব্যারিকেড দিয়ে, বিশাল বাহিনী মোতায়েন করে তাঁকে কার্যত ‘গৃহবন্দি’ করে রাখছে। যদিও শাসক দল বিজেপির দাবি, জাস্ট জেড-প্লাস (Z+) ক্যাটাগরির সুরক্ষার কারণেই এই পুলিশি বন্দোবস্ত। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের প্রশ্ন, আশির বা নব্বইয়ের দশকে কিংবা বাম জমানার শেষ লগ্নে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কি কোনো ব্যারিকেড এভাবে আটকে রাখতে পারত? তাহলে আজ কেন ঘরের ভেতরে বসেই সমাজমাধ্যম বা ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ক্ষোভ উগরে দিতে হচ্ছে তাঁকে? রাজনীতি বিদদের মতে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে তাঁর নিজের তৈরি দল অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেসের প্রতীক এবং নাম নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের পর। দল এখন আড়াআড়ি বিভক্ত। কমিশনের নির্দেশে দলের মূল ঘাসফুল প্রতীকটি ফ্রিজ বা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। একদিকে সুপ্রিম কোর্টে আইনি লড়াই, অন্যদিকে একাধিক হেভিওয়েট নেতার দলবদল বা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া—এই সব মিলিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্তমান শিবির এখন অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম সংকটে দাঁড়িয়ে। এই সাংগঠনিক দুর্বলতাই হয়তো তাঁর রাজপথের শক্তিকে অনেকটাই শ্লথ করে দিয়েছে। নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি মমতা শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে নাটকীয়ভাবে তাঁর মনোনয়ন প্রত্যাহার করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেন। এর পরেই বাধ্য হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইন্ডিয়া (INDIA) জোটের স্বার্থে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করার ঘোষণা দেন। কিন্তু সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরনো এক মামলায় কংগ্রেস প্রার্থীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এই একের পর এক রাজনৈতিক চাল ও প্রতি চালের মুখে পড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির যে চরম বিভ্রান্ত ও কৌশলগতভাবে কোণঠাসা, তা তাঁর সাম্প্রতিক বয়ান থেকেই স্পষ্ট।

বাম জমানার বিরুদ্ধে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লড়েছিলেন, তখন তাঁর পাশে ছিল এক বিশাল এককাট্টা যুব সমাজ এবং বাম-বিরোধী মধ্যবিত্ত আবেগ। কিন্তু দীর্ঘ বছর ক্ষমতায় থাকার পর এখন যখন তিনি নিজে বিরোধী আসনে, তখন তাঁর দলের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ এবং আমজনতার ক্ষোভের কারণে সেই আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন রাজপথে নামানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, একজন শাসকের আসন থেকে চ্যুত হওয়ার পর পুনরায় শূন্য থেকে বিরোধী নেত্রী হিসেবে রাস্তায় নেমে পুলিশের লাঠি খাওয়ার মতো শারীরিক ও মানসিক পরিকাঠামো এই বয়সে এসে গড়ে তোলা যেকোনো নেত্রীর পক্ষেই কঠিন। আর সেই কারণেই হয়তো আক্রমণাত্মক মেজাজের বদলে তাঁর গলায় এখন কেবলই বঞ্চনা আর অসহায়তার সুর শোনা যাচ্ছে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে বলেছেন, “আমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত বিজেপি আমার দলকে মুছে দিতে পারবে না, আমরা আত্মসমর্পণ করব না”। কিন্তু রাজপথের লড়াই যদি কেবল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিংবা ঘরের ভেতরের সাংবাদিক বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে বাংলার মানুষ যে ‘অগ্নিগর্ভা’ মমতাকে চিনত—তার পুনরাবৃত্তি হয়তো আর দেখা যাবে না। ঘরের ভেতরে বসে ‘হাউস অ্যারেস্ট’-এর অভিযোগ তুলে কান্নাকাটি বা হতাশা প্রকাশ করা কি তাঁর নতুন রাজনৈতিক রণকৌশল, নাকি সত্যিই তাঁর রাজনৈতিক লড়াইয়ের চাকা থমকে যাওয়ার ইঙ্গিত—তা ভবিষ্যৎই বলবে।

Exit mobile version