Site icon প্রিয় বন্ধু মিডিয়া

শূন্য হয়েও রাজপথে বামেরা, ক্ষমতা হারাতেই কেন ভ্যানিশ মমতা? তৃণমূলের ভেতরে কি তবে কিছুই ছিল না?

 

 

প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার উত্থান-পতন নতুন কিছু নয়। ২০১১ সালে ৩৪ বছরের একচ্ছত্র বাম শাসনের অবসান ঘটেছিল। আবার পরবর্তীতে ক্ষমতার বড়সড় রদবদলের পর বাংলার রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে গিয়েছে। কিন্তু ক্ষমতার এই পরিবর্তনের পর পরাজিত দুই শিবিরের পরিণতি আমজনতার চোখ কপালে তুলে দিয়েছে। ৩৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বামপন্থীরা আজ নির্বাচনী অঙ্কে ‘শূন্য’ ঠিকই, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটকে এইভাবে পাততাড়ি গুটিয়ে পালাতে হয়নি, বা তাদের অস্তিত্ব সংকটে পড়তে হয়নি। অথচ ক্ষমতা হারানোর পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল আজ খণ্ড-বিখণ্ড, দলীয় প্রতীক হাতছাড়া এবং নিচুতলার কর্মীশূন্য! কিন্তু কেন? তাহলে কি এই দলটার ভেতরে সত্যিই আদর্শ বা সাংগঠনিক ভিত্তির কিছুই ছিল না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের গভীর মূল্যায়নে উঠে এসেছে ৪টি অকাট্য কারণ, যা বামেদের ক্যাডার রাজ বনাম তৃণমূলের ক্ষমতার রাজনীতির আসল ফারাকটি জনসমক্ষে এনে দিয়েছে।

বামপন্থীদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ (Marxist Ideology) রয়েছে। ক্ষমতা থাক বা না থাক, একজন কমিউনিস্ট কর্মী তাঁর দলের আদর্শে বিশ্বাসী। ফলে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরেও তাঁদের নিচুতলার পার্টি ক্যাডার বা ‘স্টাডি সার্কেল’ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি। অন্যদিকে, রাজনৈতিক পণ্ডিতদের মতে, তৃণমূল কংগ্রেস কোনো নির্দিষ্ট আদর্শভিত্তিক দল হিসেবে গড়ে ওঠেনি। এটি ছিল মূলত একাধিপত্যবাদী একটি ‘ক্ষমতাকেন্দ্রিক মঞ্চ’। বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরাতে বিভিন্ন শিবিরের মানুষ এখানে জড়ো হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই, ক্ষমতার মধু ফুরিয়ে যেতেই এবং কেন্দ্রীয় এজেন্সির চাপ বাড়তেই সেই সুবিধাবাদী নেতারা আজ নিজেদের বাঁচাতে অন্য ছাতার তলায় আশ্রয় নিচ্ছেন।

সিপিআইএম (CPI-M) বা বামফ্রন্ট চলে একটি নির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে (Democratic Centralism)। সেখানে প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যরা দলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। ব্যক্তি চলে গেলেও পার্টি কাঠামো বা পলিটব্যুরো অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু তৃণমূলের পুরো পরিকাঠামো দাঁড়িয়ে ছিল একমাত্র মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত ক্যারিশমা এবং জনপ্রিয়তার ওপর। দলটিতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা বা দ্বিতীয় সারির শক্তিশালী নেতৃত্ব তৈরি হতে দেওয়া হয়নি। আজ যখন শীর্ষ স্তরে সংকট তৈরি হচ্ছে, তখন দিশাহীন নিচুতলার কর্মীরা বুঝতে পারছেন না কার নির্দেশে তাঁরা রাস্তায় নামবেন।

বামপন্থীরা দল চালাত নিজস্ব কর্মীদের দেওয়া ‘লেভি’ বা মাসিক চাঁদার টাকায়। ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরেও তাঁদের পার্টি অফিস বা দৈনন্দিন কাজ বন্ধ হয়নি, কারণ কর্মীরা নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে দল বাঁচিয়ে রেখেছেন। কিন্তু বিগত এক দশকে তৃণমূলের নিচুতলার একাংশের রাজনীতি দাঁড়িয়ে ছিল বালি, কয়লা, নিয়োগ দুর্নীতি বা সিন্ডিকেটের টাকার ওপর। ক্ষমতা হাতছাড়া হতেই সেই বেআইনি রোজগারের রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ফলে যে কর্মীরা টাকার লোভে বা ক্ষমতার দাপট দেখাতে দল করতেন, তাঁরা আজ সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। টাকা নেই তো কর্মী নেই—এই কর্পোরেট সংস্কৃতিই আজ মমতার দলকে ডোবাল।

বামেরা যখন ক্ষমতা হারিয়েছিল, তখন তাঁদের নিচুতলার ক্যাডাররা বুথ স্তরে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল কারণ তাদের বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মমতার দলের সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে যখন শক্তিশালী ও সুশৃঙ্খল ক্যাডার ভিত্তিক পরিকাঠামো এসে দাঁড়িয়েছে, তখন কেবল ‘আবেগ’ বা ‘ফেসবুক লাইভ’ করে নিচুতলা ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বুথ স্তরে প্রতিরোধ গড়ার মতো কোনো প্রশিক্ষিত ক্যাডার ফোর্স আজ মমতার দলে অবশিষ্ট নেই।

রাজনীতির পরিভাষায় বামেদের বলা হয় ‘অর্গানাইজড পার্টি’ আর তৃণমূলকে বলা হতো ‘মব-বেসড পার্টি’ বা জনসমষ্টির দল। জনসমষ্টির আবেগ যতক্ষণ ক্ষমতায় থাকে, ততক্ষণই তার দাপট। ক্ষমতা চলে গেলে সেই ভিড় নিমেষেই উধাও হয়ে যায়। বামপন্থীরা শূন্য হয়েও আজ রাজপথে মিছিল করতে পারে, কারণ তাদের আদর্শের ভিতটা মাটির গভীরে। কিন্তু নাম হারিয়ে, প্রতীক হারিয়ে এবং ক্ষমতার মধু হারিয়ে যে দল আজ ধূলিসাৎ, তা প্রমাণ করে দিল—ভিতরে কোনো শক্ত খাঁচা বা আদর্শ ছিল না বলেই ঝড়ের প্রথম ঝটকায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল মমতার সাম্রাজ্য।

Exit mobile version