প্রিয়বন্ধু মিডিয়া রিপোর্ট-পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক বড়সড় কৌশলগত বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু এখন আর কেবল তৃণমূল কংগ্রেস নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক বাণ ক্রমশ তীক্ষ্ণ হচ্ছে বামেদের দিকে। দুর্গাপূজার সময় সিপিএম-এর ঐতিহ্যবাহী বইয়ের স্টলের অনুমতি নিয়ে ফতোয়াই হোক বা বাম আমলের পুরনো ফাইল খোলার কড়া হুঁশিয়ারি—সাম্প্রতিক সময়ে বারবার বামপন্থীদের কাঠগড়ায় তুলছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, কয়েক মাস আগেও যাঁর প্রধান নিশানা ছিল কেবল তৃণমূল, তাঁর আক্রমণের অভিমুখ হঠাৎ সিপিএম-এর দিকে ঘুরে গেল কেন? এর নেপথ্যে কাজ করছে এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক সমীকরণ।
গত সেপ্টেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, দুর্গাপূজার মণ্ডপের বাইরে বাম সংগঠনগুলির বইয়ের স্টল দেওয়া রুখতে হবে যদি তারা ‘দুর্গাপূজা’ শব্দের বদলে ‘শারদোৎসব’ শব্দটি ব্যবহার করে। তাঁর অভিযোগ ছিল, উৎসবের ধর্মীয় চরিত্রকে লঘু করে কমিউনিস্ট সংস্কৃতি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। সম্প্রতি পুজো মিটে যাওয়ার পর অক্টোবর মাসেও তিনি কড়া ভাষায় বলেন, “যারা সনাতন হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে মানে না, তারা কেন পুজো মণ্ডপের সামনে স্টল দেবে? বই বিক্রি করতে হলে নিজেদের পার্টি অফিসে গিয়ে করুক।” এই আক্রমণের মাধ্যমে তিনি নিজের সনাতনী ভোটব্যাংককে যেমন সংহত রাখছেন, তেমনই বামেদের ভাবাবেগে আঘাত করছেন।
শুভেন্দু অধিকারীর আক্রমণের রণকৌশল কেবল ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক বিতর্কে সীমাবদ্ধ নয়, তা আইনি ও ঐতিহাসিক স্তরেও পৌঁছে গিয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর (২০২৬) পশ্চিম মেদিনীপুরে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী অত্যন্ত কড়া ভাষায় ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন এবং ছোট আঙারিয়ার মতো ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, “নন্দীগ্রামে ঢুকে যেভাবে সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, সেই সমস্ত পুরনো মামলা, যেখানে তপন ঘোষ এবং স্থানীয় সিপিএম নেতারা জড়িত ছিলেন, সেগুলি আবার রি-ওপেন করা হবে এবং তদন্ত হবে।” একই সাথে তিনি তৃণমূল ও সিপিএম-এর উপদ্রবকারীদের একসারিতে বসিয়ে জেল খাটানোর হুঁশিয়ারিও দেন।
রাজ্যে তৃণমূল ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রধান বিরোধী দল হিসেবে কারা জায়গা করে নেবে, তা নিয়ে তীব্র লড়াই চলছে। সিপিএম যদি কোনোভাবে নিজেদের প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে তুলে ধরতে পারে, তবে তা বিজেপির জন্য বড় চিন্তার কারণ হবে। তাই শুরুতেই বামেদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে চাইছেন শুভেন্দু অধিকারী। বিগত নির্বাচনগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের এক বিশাল অংশের বামপন্থী ভোট বিজেপির বাক্সে এসেছিল, যা রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পথ প্রশস্ত করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী খুব ভালো করেই জানেন, সেই অসন্তুষ্ট ভোটব্যাংক যদি আবার কাস্তে-হাতুড়ির দিকে ফিরতে শুরু করে, তবে তা বর্তমান সরকারের স্থিতিশীলতায় ধাক্কা দেবে। শুভেন্দু অধিকারী সুকৌশলে আমজনতার মনে এই ধারণা তৈরি করতে চাইছেন যে, তৃণমূল এবং সিপিএম আসলে একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। দুজনেই সমানভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত এবং সনাতন সংস্কৃতি বিরোধী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নবান্নের রাশ হাতে নেওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী এখন আর শুধু বর্তমানকে সামলাচ্ছেন না, বরং আগামী ২০-২৫ বছরের জন্য বাংলায় বামপন্থার পুনরুত্থানের সমস্ত রাস্তা চিরতরে বন্ধ করে দিতে চাইছেন। এটি কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ক্ষোভ নয়, বরং ঠাণ্ডা মাথার সুপরিকল্পিত মাস্টার স্ট্র্যাটেজি।
